ঐতিহ্যমণ্ডিত ভারতের প্রজাতন্ত্র দিবস | What is Republic Day Explained in Bengali


বৃহত্তম গণতন্ত্র হিসেবে ভারতবর্ষের জন্ম হয়েছিল ২৬ শেজানুয়ারি , ১৯৫০ খ্রিস্টাব্দে । তাই স্বাধীনতা দিবসের মতোই সেই দিনটির গুরুত্ব অপরিসীম। এই দিনটিকে আমরা সাধারণতন্ত্র দিবস বা প্রজাতন্ত্র দিবস হিসেবে পালন করি  ।

ঐতিহ্যমণ্ডিত ভারতের প্রজাতন্ত্র দিবস | What is Republic Day Explained in Bengali

প্রজাতন্ত্র কী  | What does Republic Mean in Bangla

দেশের আধুনিকতম শাসনব্যবস্থা  অর্থাৎ  গণতান্ত্রিক পরিকাঠামোমূলক শাসন ব্যবস্থা বলতে বোঝায় জনগণের দ্বারা ,জনগণের জন্য  শাসন ব্যবস্থা যেখানে জনগণই সর্বেসর্বা ।

আমাদের দেশে শীর্ষে অধিষ্ঠান রত  এই গণতান্ত্রিক  রাষ্ট্রব্যবস্থায় আছেন যিনি, তিনি বংশপরম্পরা সাপেক্ষে মনোনীত হন না । এই দেশের জনগণের মতানুযায়ী   পরোক্ষভাবে নির্বাচিত হয়ে থাকেন। গণতন্ত্রের শীর্ষস্থানীয় অধিষ্ঠানকে মনোনয়ন ও নির্বাচন   করার ক্ষেত্রে প্রজা অর্থাৎ জনগণের এই স্বতন্ত্র ও বিশেষ   ভূমিকাকেই ‘প্রজাতন্ত্র’ বলা হয়। তন্ত্র   শব্দটিকে এই ক্ষেত্রে মত আর প্রজাতন্ত্র বলতে এখানে প্রজাদের বা দেশের  সাধারণ নাগরিকদের  মতের কথাই বলা হয়েছে যেখানে তাদের কথাই শেষ কথা।

প্রজাতন্ত্র দিবস পালনের ইতিহাস | History of Republic Day in Bengali

 স্বাধীনতা আন্দোলনের ফলস্বরূপ ১৯৪৭ সালের ১৫ ই আগস্ট ভারত ব্রিটিশ রাজের কাছ থেকে স্বাধীনতা অর্জন করে।  তবে, মাউন্ট ব্যাটেনের সাংবিধানিক  রাজতন্ত্র বলবৎ থাকার কারণে ও  পরিস্থিতি প্রতিকূল থাকার  দরুন  ভারতের পক্ষে স্থায়ী সংবিধান প্রণয়ন করা সম্ভব হয়নি ।  এই সময়ে, ঔপনিবেশিক  সরকারের   ১৯৩৫  এর ভারত শাসন আইন রাজ্য পরিচালনার ক্ষেত্রে  মূলত বিবেচিত ও কার্যকরী ছিল।

republic-day-rachana bangla

স্থায়ী সংবিধানের খসড়া তৈরির জন্য, ১৯৪৭ সালের ২৮ আগস্ট একটি খসড়া কমিটি নিয়োগ করা হয় যেখানে ডাঃ বি আর আম্বেদকরকে এই খসড়া কমিটির চেয়ারম্যান হিসাবে নিযুক্ত করা হয়েছিল।  ১৯৪৭ সালের ৪ নভেম্বর এই কমিটি সংবিধানের খসড়া তৈরি করে  এবং তা গণপরিষদের কাছে পর্যালোচনার জন্য জমা দেয়া হয়ে থাকে। বিভিন্ন অধিবেশনগুলিতে এই সমাবেশের সভা অনুষ্ঠিত হয়ে থাকে যা জনসাধারণের জন্য উন্মুক্ত ছিল দুই বছর, ১১মাস এবং ১৮ দিন। 

অবশেষে  ১৯৫০ সালের ২৪ শে জানুয়ারী, ৩০৮ জন সংসদীয়  শক্তিশালী সদস্যরা কিছু সংশোধনীর পরে খসড়া নথির দুটি কপির ওপর স্বাক্ষর রেখেছিলেন, যার একটি হিন্দি ও ইংরেজিতে লেখা ছিল।  ১৯৫০ সালের ২৬ শে জানুয়ারী সারা দেশে এই অনুমোদিত খসড়া দলিলটি কার্যকর হয়েছিল যা ভারতের সংবিধান হিসাবে আমাদের কাছে  পরিচিত।  এই দিনটি ভারতের প্রথম রাষ্ট্রপতি ডঃ রাজেন্দ্র প্রসাদের মেয়াদ শুরুর দিন হিসাবেও স্বীকৃত।  তার পর থেকে প্রতিবছর আমরা ২৬শে  জানুয়ারিকে আমাদের প্রজাতন্ত্র দিবস হিসাবে পালন করে থাকি। এই বিশেষ দিনটিতে  ভারতীয় গণপরিষদ সংবিধান কার্যকরী হয় এবং  ভারত একটি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে পরিণত হয়।

প্রজাতন্ত্র দিবস উদযাপন | How Republic Day is Celebrated

প্রজাতন্ত্র দিবস উদযাপন দেশজুড়ে হলেও, প্রধান উদযাপনগুলি নয়াদিল্লির রাজপথে দেখা যায়, সেখানে রাষ্ট্রপতি, প্রধানমন্ত্রী এবং অন্যান্য মন্ত্রীরা উপস্থিত থাকেন।  দিল্লিতে প্রজাতন্ত্র দিবসের বর্ণাঢ্য  কুচকাওয়াজটি  ভারতের প্রজাতন্ত্র দিবস উদযাপনকে বিশেষ ভাবে   চিহ্নিত করে । এটি ভারতের প্রজাতন্ত্র দিবস উদযাপনের  মূল আকর্ষণ, যা ৩ দিন ধরে চলতে থাকে।  মোটরকেড এর শোভাযাত্রা ভারতীয় সুরক্ষা ব্যবস্থার অনমনীয়তা   এবং সামাজিক ঐতিহ্যের গাথা বর্ণনা করে ।

republic-day-paragraph-in-bengali

 প্যারেড শুরুর পূর্ববর্তী সময়ে প্রধানমন্ত্রী অমর জওয়ান জ্যোতিতে পুষ্পস্তবক অর্পণ করে থাকেন ও রাজপথের একপাশে ইন্ডিয়া গেটে ভারতীয় বীর  যোদ্ধাদের স্মরণে দুই মিনিটের নীরবতা পালন করেন। বীর শহীদ যারা দেশের জন্য আত্মত্যাগ   করেছিলেন তাদের এই দিনে গভীর ভাবে স্মরণ করা হয়। 

এর পর রাষ্ট্রপতি অন্যান্য বিশিষ্ট ব্যক্তিদের সাথে মিলিত হন এবং প্রধান অতিথির সাথে রাজপথে অবস্থিত  মূল মঞ্চে আসেন। রাষ্ট্রপতির দেহরক্ষকরা ঘোড়ার পিঠে করে তাদের  যথাযথভাবে পরিবেষ্টিত করে  পথপ্রদর্শন করেন।   রাষ্ট্রপতি  জাতীয় পতাকা উত্তোলন করেন  এবং   21-গান স্যালুট  এর সাথে  সাথে জাতীয় সংগীত পরিবেশন করা হয়  ।

এর পরে, সশস্ত্র বাহিনীর রেজিমেন্টরা তাদের পদচারণা শুরু করার আগেই অশোক চক্র এবং কীর্তি চক্রের মতো প্রয়োজনীয় সম্মাননা রাষ্ট্রপতি দ্বারা কৃতীদের প্রদান করা হয়ে থাকে ।  সশস্ত্র বাহিনীর সদস্যদের  অসামান্য  কীর্তি ও  শৌর্য  বৃত্তির জন্য সাহসিকতার পুরষ্কার প্রদান করা হয় এবং তদুপরি, বেসামরিক নাগরিকরা যারা বিভিন্ন পরিস্থিতিতে তাদের সাহসিকতার স্বতন্ত্র বিক্ষোভ দেখিয়ে খ্যাতি অর্জন করেছেন তাঁদেরও সম্মানিত করা হয় ।

জাতীয় সাহসী পুরষ্কার প্রাপ্ত তরুণ বিজয়ীরা শোভাযাত্রায় অংশগ্রহণ করে  পর্যবেক্ষকদের দৃষ্টি আকর্ষণ করে  । ২০১৪ খ্রিঃ ৬৫ তম প্রজাতন্ত্র  দিবসে মহারাষ্ট্র সরকার প্রথম বার দিল্লী  কুচকাওয়াজের অনুকরণে মেরিন ড্রাইভ বরাবর তাদের নিজস্ব কুচকাওয়াজ আয়োজিত করে  ।

প্যারেড

নৌবাহিনী ছাড়াও, ভারতীয় সেনাবাহিনী এবং বিমান বাহিনীর ৯ থেকে ১২ টি অনন্য রেজিমেন্ট তাদের দলীয় অফিসিয়াল ইউনিফর্মে শোভাযাত্রায় অংশগ্রহণ করেন  ।  ভারতীয় সশস্ত্র বাহিনীর সর্বাধিনায়ক, রাষ্ট্রপতিকে স্যালুট জানিয়ে সম্মান প্রদর্শন  করেন।  এই প্যারেডে ভারতের তিনটি সামরিক শক্তির ১২ টি দলসহ বিভিন্ন অংশগ্রহণকারী  যোগ দিয়ে থাকেন ।   কুচকাওয়াজে প্রধান দ্রষ্টব্যের গুলির মধ্যে একটি হল ‘ক্যামেল মাউন্টেড’ বর্ডার সিকিউরিটি ফোর্স যা দেশের অন্যতম প্রধান  সামরিক শক্তি।

  সারা দেশ থেকে নির্বাচিত সেরা এন সি সি ক্যাডেটরা  এ উপলক্ষে অংশ নিয়ে থাকেন । এছাড়া ও রাজধানীর বিভিন্ন বিদ্যালয়ের স্কুল পড়ুয়ারা এই অনুষ্ঠানের জন্য বিশেষভাবে প্রস্তুতি নেয়  । তাদের সাজ সজ্জা ও প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত বর্ণময় ড্রিলগুলি  সকল দর্শকদের মনোরঞ্জন করে যা দেশের ঐতিহ্যকে স্বমহিমায় তুলে ধরে। ভারতের বিভিন্ন রাজ্য এবং কেন্দ্রশাসিত রাজ্যগুলির বর্ণময়  সংস্কৃতির নমুনা প্রদর্শন করা হয় বিভিন্ন দৃষ্টিনন্দন   ট্যাবলো গুলির মাধ্যমে ।

 প্রতিটি উপস্থাপনা ভারতের জীবনযাপনের বৈচিত্র্য এবং ঐতিহ্যশালী সম্পদের পরিচয় বহন করে  । কুচকাওয়াজের বৈশিষ্ট্য হিসাবে প্রায় ১২০০ স্কুলছাত্রী নৃত্য এবং অন্যান্য সাংস্কৃতিক ক্রিয়াকলাপ উপস্থাপন করে। প্রত্যেক  বছরই বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত থাকেন পৃথিবীর নানা দেশের কোন না কোন নেতা। ভারতবর্ষে প্রজাতন্ত্র দিবস পালনকে কেন্দ্র করে গোটা দেশে এক অদ্ভুত উদ্দীপনার সঞ্চার হয়। তাৎপর্যগত দিক থেকে এই দিনটি কিন্তু ক্ষেত্রবিশেষে  স্বাধীনতা দিবসের থেকেও  অধিক গুরুত্ব লাভ করে থাকে। 

প্রজাতন্ত্র দিবস উদ্‌যাপনের ৩ দিন পর, ২৯শে জানুয়ারি সন্ধ্যেবেলা এর আনুষ্ঠানিক সমাপ্তি ঘোষিত  হয যেখানে  ভারতের সামরিক বাহিনীর তিন প্রধান শাখা ভারতীয় স্থলসেনা, ভারতীয় নৌবাহিনী এবং ভারতীয় বায়ুসেনা  অংশগ্রহণ করে থাকে। রাজপথের ধারে অবস্থিত  ভারতের কেন্দ্রীয় সচিবালয় এবং  রাষ্ট্রপতি ভবনের নর্থ ব্লক ও সাউথ ব্লক ভবন দু’টির মধ্যবর্তী রাইসিনা হিল ও বিজয় চকে এই সমাপ্তি  অনুষ্ঠানটি উদযাপিত হয়  ।

আনন্দ উৎসব পালন

প্রতিটি ভারতবাসীর কাছেই  ২৬ শে জানুয়ারি  প্রকৃতই আনন্দের দিন। এই দিনটিতে ভারতের সর্বত্র সবেতন ছুটি ঘোষণা করা হয় এবং স্কুল কলেজ সব বন্ধ থাকে। সরকারি প্রধান কার্যালয়, রাজভবন ,পার্লামেন্ট ভবন প্রভৃতিতে জাতীয় পতাকা উত্তোলন করা হয়। আবার সমিতি প্রাঙ্গণেও পতাকা উত্তোলিত হতে দেখা যায় ।

এদিন কোনো কোনো সমিতির পক্ষ থেকে জাতীয় পতাকা সঙ্গে নিয়ে শোভাযাত্রা বের করা হয় এবং সভা সমিতি করে বক্তৃতার মাধ্যমে দিনটির তাৎপর্য ব্যাখ্যা করা হয় ।তার সঙ্গে সঙ্গে আম জনতারও  স্মরণ করেন  সেই সব বীর নির্ভীক সৈনিকের আত্মত্যাগকে যাঁদের তাজা রক্তে স্নাত হয়ে ভারতমাতা স্বাধীনতার মালা গলায় পড়েছিল কারণ তাঁদের আদর্শে অনুপ্রাণিত হতে পারলে দিনটি পালনের প্রকৃত স্বার্থকতা পাওয়া যাবে।   

প্রজাতন্ত্র দিবসের প্রকৃত গুরুত্ব  | Importance of Republic Day explained in Bangla

প্রজাতন্ত্র দিবসের তাৎপর্য যেমন অর্থবহ গুরুত্বও তেমনি অপরিসীম !যথাযথ উপলব্ধি করতে না পারলে এ দিনটির প্রকৃত মর্যাদা দেওয়া সম্ভব নয়।  আমরা ৭১ তম প্রজাতন্ত্র দিবস পালনের দোরগোড়ায় দাঁড়িয়ে  আমরা স্পষ্ট দেখতে পাই ভারতবর্ষের সর্বত্র একটা বিশৃঙ্খলার ছাপ ।এতে জাতীয় সংহতি বিপন্ন হচ্ছে এবং জাতীয় ভিত্তিমূল ও ক্রমশ দুর্বল হয়ে পড়ছে  ।

তাই যথেষ্ট বুদ্ধিমত্তার সঙ্গে এ দিনটির গুরুত্ব উপলব্ধি করে যাতে দেশের সমস্ত নাগরিককে একসঙ্গে দীক্ষিত করা যায় সেদিকে আমাদের সজাগ দৃষ্টি দিতে হবে। ছাব্বিশ জানুয়ারি শুধু একটি তারিখ ই না ;এটি সার্বভৌম  প্রজাতন্ত্রের এক উজ্জ্বল প্রতীক  । এর প্রকৃত মর্যাদা উপলব্ধি করতে পারলেই প্রজাতান্ত্রিক  স্বার্থকতা রূপায়িত হতে পারে  । 

উপসংহার 

সার্বভৌম সাধারণতান্ত্রিক এই ভারতবর্ষের প্রতিটি নাগরিক গণতন্ত্রের আদর্শে বিশ্বাসী ,তাই গণতন্ত্র রক্ষায় প্রকৃত দায়িত্বও তাদের ওপর ন্যস্ত । এই গুরুভার যাতে সকলে সমান মর্যাদার সঙ্গে পালন করতে পারে সেদিকে আমাদের দৃষ্টি রাখতে হবে  তবেই ভারতবর্ষ বিশ্বে শ্রেষ্ঠ আসন লাভ করে সকল জাতির কাছে নিজেকে দৃঢ়ভাবে প্রতিষ্ঠা করতে পারবে  ।

FAQ (সম্ভাব্য প্রশ্নাবলি  )

ভারতের প্রজাতন্ত্র দিবস আমরা কবে উদযাপিত করি ?

প্রতি বছর ২৬ শে জানুয়ারি আমরা ভারতীয় প্রজাতন্ত্র দিবস উদযাপন করি।

ভারতীয় গণপরিষদ সংবিধান কবে কার্যকরী হয় ?

১৯৫০ সালের ২৬ জানুয়ারী গণপরিষদ সংবিধান কবে কার্যকরী হয়  ।

কেন্দ্রীয় কুচকাওয়াজের অনুষ্ঠান কোথায় সম্পাদিত হয় ?

কেন্দ্রীয় কুচকাওয়াজের অনুষ্ঠানটি হয় নতুন দিল্লির রাজপথে।

বীর সৈনিকদের উদ্দেশ্যে তৈরি স্মারকের নাম কি?

অমর জওয়ান জ্যোতি

সাধারণতন্ত্র দিবস উদযাপনের সমাপ্তি কী দ্বারা সূচিত হয় ?

বীটিং রিট্রীট  এর  মাধ্যমে   সাধারণতন্ত্র দিবস উদ্‌যাপনের আনুষ্ঠানিক সমাপ্তি সূচিত হয়।

Close

Recent Posts

link to প্রতিশ্রুতি ও প্রতিজ্ঞা নিয়েই দু চার কথা | Bengali Quotes & Lines On Promise | Pratigya nie Ukti

প্রতিশ্রুতি ও প্রতিজ্ঞা নিয়েই দু চার কথা | Bengali Quotes & Lines On Promise | Pratigya nie Ukti

প্রতিজ্ঞা বা প্রতিশ্রুতি হলো একটি অলিখিত অঙ্গীকার যা কোনো মানুষকে প্রদান...