কার্তিক পুজো বিস্তারিত তথ্যাদি ~ Everything About Kartik Puja in Bengali


কোথাও খ্যাতি ‘স্কন্দ’ নামে, কোথাও বা ‘মুরুগন’ আবার কেউ তাকে ডাকে ‘সুব্রহ্মণ্য’ নামে। প্রকৃতপক্ষে তিনি দেব সেনাপতি, যুদ্ধের দেবতা ও আমাদের ঘরে ঘরে পরম পূজনীয় কার্তিকেয় বা কার্তিক, যিনি পুরুষ শিব ও আদি পরাশক্তি পার্বতীর পুত্ররূপে সু প্রসিদ্ধি লাভ করেছেন। তাই দেবলোকে যেখানেই যুদ্ধ হয় সেখানেই কার্তিকের ডাক পড়ে।

তিনি বৈদিক দেবতা নন; কার্তিক হলেন পৌরাণিক দেবতা।ভারতে উনি প্রাচীন দেবতা হিসেবে পূজিত হন এবং প্রাচীন ভারতের প্রায় সর্বত্র ই কার্তিক পূজার প্রচলন ছিল। দুর্গাপুজোর কিছু সময় পরেই অর্থাৎ কার্তিকমাসের সংক্রান্তিতে হয় কার্তিকের পুজো।

অন্যান্য হিন্দু দেবদেবীর মতো কার্তিকও একাধিক নামে সম্বোধিত হয়ে থাকেন যেমন:কৃত্তিকাসুত, আম্বিকেয়, নমুচি, শিখিধ্বজ, অগ্নিজ, বাহুলেয়, ক্রৌঞ্চারতি, শরজ, তারকারি, শক্তিপাণি, বিশাখ, ষড়ানন, গুহ, ষান্মাতুর, কুমার, সৌরসেন, দেবসেনাপতি গৌরী সুত ইত্যাদি।

kartik puja r byapare somosto tothyo

নামকরণ

কৃত্তিকা নক্ষত্রে কার্তিক ঠাকুরের জন্ম হয়েছিল এবং ছয় কৃত্তিকার দ্বারা তিনি পুত্ররূপে গৃহীত ও প্রতিপালিত হয়েছিলেন বলে তাঁর নাম কার্তিকেয় বা কার্তিক। কার্তিকের আরো অনেক নাম আছে যেমন গুহ, পাবকি, মহাসেন, ষন্মুখ,কুমার, কুমারেশ, গাঙ্গেয়, বিশাখ, মহাসেন, কুক্কুটধ্বজ, নৈগমেয়।

বর্ণনা

পুরাণ অনুসারে কার্তিক গাত্র হলুদবর্ণের। তিনি চিরকুমার। তবে পুরাণ মতে কিছু কিছু ক্ষেত্রে তাঁর বিবাহের উল্লেখও পাওয়া গেছে। কার্তিকের বাহন ময়ূর।সৌন্দর্য এবং শৌর্য এই দুটি বৈশিষ্ট্যই ময়ূরের মধ্যে বিদ্যমান। কার্তিকের ছয়টি মাথা।তাই তিনি ষড়ানন। পাঁচটি ইন্দ্রিয় অর্থাৎ চোখ, কান, নাক, জিভ ও ত্বক ছাড়াও একাগ্র মন দিয়ে তিনি যুদ্ধ করেন। । তাঁর হাতে থাকে বর্শা-তীর-ধনুক।

কারো মতে মানব জীবনের ষড়রিপু- কাম(কামনা), ক্রোধ (রাগ), লোভ(লালসা),মদ(অহং), মোহ (আবেগ), মাত্সর্য্য (ঈর্ষা)কে সংবরণ করে দেব সেনাপতি কার্তিক যুদ্ধক্ষেত্রে সদা সজাগ থাকেন।

পুরাণমতে তিনি তরুণ সদৃশ, সুকুমার, শক্তিধর এবং সর্বসৈন্যের পুরোভাগে অবস্থান করে ।

দূর্গা পূজার শুভেচ্ছা মেসেজের কালেকশন ~ Durga Puja Greetings Collection

কার্তিক পূজা কেন করা হয়

কথিত আছে যে ব্রহ্মার বরে মহাতেজস্বী তারকাসুরকে নিধনের জন্যই নাকি পরাক্রমশালী যোদ্ধা কার্তিকের জন্ম হয়েছিল। তারকাসুরকে বধ করা কোনো দেবতার পক্ষে সম্ভবপর হয়ে উঠছিল না এবং তার অত্যাচারে দেবকুল অতিষ্ঠ হয়ে পড়েছিল এবং ঠিক সেই সময় দৈববলে প্রাপ্ত অজেয় শক্তির অধিকারী এই দেবশিশু কার্তিকেয় তারকাসুর নিধন করেছিলেন এবং এই তারকাসুর নিধন করে দেবকুলে কার্তিক হলেন দেব সেনাপতি। তাই কার্তিকের পুজো হয় মহা আড়ম্বর সহকারে ।

ভারতীয় পুরাণগুলির মধ্যে স্কন্দ পুরাণে কার্তিকের বিষয়ে সবিস্তারে রচনা করা আছে। মহাভারতে এবং সঙ্গম তামিল সাহিত্যে ও কার্তিকের নানান মাহাত্ম্যের কথা বর্ণিত রয়েছে।

details of kartik puja history mantra importance

কার্তিক পূর্ণিমার মাহাত্ম্য

মনে করা হয় যে কার্তিক পূর্ণিমার উৎসবটি শুরু হয় ‘প্রবোধিনী একাদশীর’ দিন থেকে; যেটি শুক্লপক্ষের একাদশী এবং পূর্ণিমা কার্তিক মাসের পঞ্চদশ দিন। এই কারণে পাঁচ দিন কার্তিক পূর্ণিমার উৎসব চলে ।এই দিনটি ‘তুলসী বিবাহ’-এর উদযাপনের দিনটিকেও চিহ্নিত করে । কথিত আছে যে এই বিশেষ দিনটিতে দেবী বৃন্দ (তুলসী গাছ) সহ ভগবান বিষ্ণুর বিবাহ অনুষ্ঠান সম্পন্ন হয়েছিল।

কিছু ভক্তরা এই দিনে প্রদীপও দান করেন যেটিকে খুবই লাভজনক বলে মনে করা হয়। বৈদিক মন্ত্র পাঠ করা ও ভজন পরিবেশন করা এই দিনটিতে শুভ বলে মনে করা হয়। কিছু কিছু ভক্ত শিবের জন্য একটি বিশেষ পুজোরও আয়োজন করেন। অনেকে বিশ্বাস করেন যে ভগবান বিষ্ণু এই দিনে শিবের উপাসনা করেছিলেন এবং তাঁকে এক হাজার পদ্ম ফুলও প্রদান করেছিলেন ।

Durga Puja Unknown facts in Bengali

ভারতে ও বিদেশে বিভিন্ন জায়গায় কার্তিক পূজা

কালের গতির সাথে সাথে উত্তর ভারতে কার্তিকের মাহাত্ম্য অনেকটা কমে আসে এবং আরাধ্য দেবতা হিসেবে কার্তিক ঠাকুর দক্ষিণ ভারতে অধিক জনপ্রিয়তা লাভ করে উত্তর ভারত থেকে। তামিল ভাষীদের কাছে কার্তিকের রূপ হলো ‘মুরুগন’ যিনি হলেন তাদের প্রধান আরাধ্য দেবতাদের মধ্যে অন্যতম। পরিলক্ষিত করা গেছে যে ভারতের প্রতিবেশী দেশগুলির মধ্যে যেখানেই তামিলদের সংখ্যা বেশি, যেমন শ্রীলঙ্কা, মালয়েশিয়া, সিঙ্গাপুর, মরিশাস- সেখানেই মুরুগন সুপরিচিত এবং সাড়ম্বরে পুজিত হয়ে থাকেন।

তবে পশ্চিমবঙ্গে আধুনিক বাঙালিদের মধ্যে কার্তিক ঠাকুর পুজো নিয়ে খুব বেশি মাতামাতি কখনোই হয় না। তবে দেখা গেছে যে কোন কোন প্রাচীন পরিবারে ধারাবাহিকভাবে এবং এক-দুটি বিশেষ অঞ্চলে খুব হইচই করে এই পুজার আয়োজন করা হয়; কিন্তু সর্বজনীন পুজো হিসাবে কার্তিকপুজো বাঙালি সমাজে এখন আর সেরকম ব্যাপকভাবে জনপ্রিয় নয়।

Janmasthami greetings and wishes in Bangla

পশ্চিমবঙ্গে কার্তিক পূজা

পশ্চিম বাংলায় কার্তিক সংক্রান্তির দিনে সাংবাৎসরিক কার্তিক পূজার আয়োজন করা হয়ে থাকে। তুলনামূলকভাবে আগের থেকে এখন কার্তিক পুজোর জনপ্রিয়তা কিছুটা কমলেও এখনো পশ্চিমবঙ্গের কিছু জেলায় মহাসমারোহে অনুষ্ঠিত হয় এই পূজা ।পশ্চিমবঙ্গের হুগলি জেলার চুঁচুড়া-বাঁশবেড়িয়া কাটোয়া এলাকায় কার্তিক পূজা বেশ প্রসিদ্ধি লাভ করেছে। তাছাড়া ও বাংলার গণিকা সমাজে কার্তিক পূজা বিশেষ ভাবে জনপ্রিয় ।আশ্বিন মাসে দুর্গাপুজোর সময়েও কার্তিক ঠাকুরের পূজা করা হয়।কলকাতাতে তার মন্দির ও বর্তমান ।

পাল বাড়ির ঐতিহ্যমণ্ডিত তিন কার্তিক

পশ্চিম বর্ধমান জেলায় গৌরবাজার যা পান্ডবেশ্বর থেকে ১৫ কিলোমিটার দূরের একটি গ্রাম সেখানে বিগত ১৬৬ বছর ধরে কার্তিক পুজো হয়ে আসছে বলে অনুমান করা হয়। এই পুজোতে তিনটি কার্তিক যথা বড় কার্তিক, মেজো কার্তিক, ছোটো কার্তিক এর মূর্তি উপস্থিত থাকে। ঐতিহাসিক এই তিন কার্তিকের পৌত্তলিকতার পেছনে লুকিয়ে আছে প্রত্যেক মানুষের মধ্যে এক অদ্ভুত কৌতুহলতা।

কথিত আছে যে আনুমানিক ১৮৫৩ সাল নাগাদ জমিদার জয়নারায়ণ পাল, শ্যাম পাল ও লক্ষ্মীনারায়ণ পাল সন্তানহীন হওয়ার কারণে চরম দুশ্চিন্তার মধ্যে ছিলেন আর তখন ই এক রাত্রে স্বপ্নাদেশে জয়নারায়ণ পাল অবগত হন যে তাঁদের তিন ভাইকে কার্তিক পুজো করতে হবে আর তবেই তাঁদের শূন্য‌ কোল আলোকিত হবে।

আর সেই কারণেই এই তিন ভাই মিলে অভিনব একটি মন্দির প্রতিষ্ঠা করে একসাথে তিনটি কার্তিক পূজা করতে শুরু করেন এবং আনুমানিক ১৮৫৭ সালে লক্ষ্মীনারায়ণ পালের এক পুত্র সন্তান হয় যার নামকরণ করা হয় ধ্বজাধারী পাল;এবং আর অপর দুই ভাইয়ের একটি করে কন্যা সন্তানের প্রাপ্তি ঘটে । সেই সৌভাগ্যের পরম্পরা তাঁরা বহন করে আসছেন এবং সেই অনুযায়ী পুজো করে চলেছেন তাঁদের বংশধরেরা নিয়মিতভাবে । এই পুজোর পর থেকে সন্তান না হওয়ার অন্ধকার সেই বংশকে আর এসে ঘিরে ধরেনি। এই পুজো আজও বর্তমান এবং মহাসমারোহে আজও উদযাপিত হয় ।

Ratha Yatra History, Importance, Story in Bangla ~ রথযাত্রার ব্যাপারে বিস্তারিত তথ্য

পুজো সম্বন্ধীয় কিছু লোকাচার

কার্তিক ঠাকুরের সঙ্গে ছয় সংখ্যা ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে আছে আর সেই কারণেই হয়ত স্ত্রী ষষ্ঠীর সাথে তার মিল৷ যতক্ষণ না বাচ্চা বড় হচ্ছে ততদিন অবধি তাদের বিপদ থেকে রক্ষা করেন ৷কথিত আছে কার্তিক ঠাকুরের কৃপা পেলে পুত্রলাভ এবং ধনলাভ হয়। সেজন্য সদ্য বিয়ে হয়েছে অথবা বিয়ের এক বছর হয়ে গেছে কিন্তুু এখনও সন্তান আসেনি এমন দম্পতির বাড়ির সামনে কার্তিক ঠাকুরের মূর্তি ফেলা একটি জনপ্রিয় লোকাচারের মধ্যে পড়ে ।

সুঠাম গড়নের বস্ত্রহীন কাটোয়ার কার্তিক লড়াই পশ্চিমবঙ্গ জেলার মধ্যে খুবই বিখ্যাত। এই কার্তিক পুজো এত বিখ্যাত তাই এখানে এক পুজোর সঙ্গে অন্য পুজোর প্রতিদ্বন্দ্বিতাকে কার্তিক লড়াই বলে অনেকে অভিহিত করেন । পুজোর এই বিশেষ দিনটিতে কাটোয়ার পথে এক বড়সড় মিছিল নামে । সব পুজো-মণ্ডপের দলবল তাদের ঠাকুর সমেত বের করে বর্ণাঢ্য শোভাযাত্রা।

লড়াই চলে কার ঠাকুর আগে যাবে এ বিষয় নিয়ে ।এই অভিনব লড়াই বা যুদ্ধ রীতিমতো লাঠিসোটা, এমনকী তরোয়াল নিয়েও চলতে থাকে ।হালিশহরের’জ্যাংড়া কার্তিক’ ও ‘ধুমো কার্তিক’ পূজা ও এ ক্ষেত্রে বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য ।এভাবেই যুদ্ধ আর সন্তান লাভ- দুইয়ের অনুষঙ্গেই কার্তিক ঠাকুরকে শ্রদ্ধার সাথে স্মরণ করে আপামর বাঙালি।তাকে নিয়ে আছে এক বহু পরিচিত ছড়া –
“কার্তিক ঠাকুর হ্যাংলা, একবার আসেন মায়ের সাথে, একবার আসেন একলা।”

প্রণাম মন্ত্র

ওঁ কার্ত্তিকের মহাভাগ দৈত্যদর্পনিসূদন। প্রণোতোহং মহাবাহো নমস্তে শিখিবাহন। রুদ্রপুত্র নমস্ত্তভ্যং শক্তিহস্ত বরপ্রদ।

দুর্গা এবং কালীপূজা র মত অত জনপ্রিয় না হলে ও কার্তিক পুজো প্রায় সব ঘরে ঘরেই হয়ে থাকে। পশ্চিমবঙ্গের বাড়িতে বাড়িতে যে পূজা হয় তা অধিকাংশ ক্ষেত্রে সন্তানহীন , সদ্য বিবাহিত রা ই আয়োজন করে থাকে। প্রকৃত ভক্তি ও মন প্রাণ দিয়ে আরাধনা করলে কার্ত্তিক ঠাকুর সবার মনোকামনা পূর্ণ করেন।

Viral Telegram Channel 🔥

Recent Posts