বাংলা শিশুসাহিত্যের কথা উঠলে যে মানুষটির নাম সবার আগে মনে পড়ে, তিনি সুকুমার রায়। তাঁর লেখা পড়ে কখনও অকারণে হেসে উঠতে হয়, কখনও আবার শব্দের অদ্ভুত খেলা দেখে অবাক হতে হয়। তাঁর গল্পের চরিত্ররা যেন আমাদের চেনা পৃথিবীর মানুষ হয়েও একটু অন্যরকম। সেখানে যুক্তি আছে, অথচ সেই যুক্তির পথ ধরেই তৈরি হয় অসম্ভব সব কাণ্ডকারখানা।

সুকুমার রায় শুধু শিশুদের জন্য মজার ছড়া লিখতেন না। হাস্যরসের আড়ালে তিনি সমাজের অসংগতি, মানুষের অদ্ভুত আচরণ এবং প্রচলিত চিন্তাভাবনার সীমাবদ্ধতাকেও তুলে ধরেছেন। তাঁর সাহিত্য পড়তে পড়তে বোঝা যায়, অর্থহীনতার মধ্যেও কখনও কখনও কত গভীর অর্থ লুকিয়ে থাকতে পারে। মাত্র ৩৫ বছরের জীবনে তিনি বাংলা সাহিত্যে এমন একটি জায়গা তৈরি করে গেছেন, যা আজও অমলিন।
সুকুমার রায়ের জন্ম ও পারিবারিক পরিচয়, Sukumar Ray Birth and Family Background
সুকুমার রায়ের জন্ম ১৮৮৭ সালের ৩০ অক্টোবর, কলকাতায়। তাঁর বাবা ছিলেন বিশিষ্ট শিশুসাহিত্যিক, চিত্রকর ও প্রকাশক উপেন্দ্রকিশোর রায়চৌধুরী। মা বিধুমুখী দেবী ছিলেন ব্রাহ্মসমাজের বিশিষ্ট ব্যক্তিত্ব দ্বারকানাথ গঙ্গোপাধ্যায়ের কন্যা।
বাংলা রিওয়ার্ডস ও ক্যাশ প্রাইজ শীঘ্রই আসছে!
সবার আগে সুযোগ পেতে এখনই ওয়েটলিস্টে যোগ দিন।
সুকুমার রায় এমন একটি পরিবারে বড় হয়ে ওঠেন, যেখানে সাহিত্য, শিল্প, বিজ্ঞান ও সংস্কৃতির চর্চা ছিল দৈনন্দিন জীবনেরই অংশ। তাঁর বাবা উপেন্দ্রকিশোর শুধু গল্প লিখতেন না, ছবি আঁকা, সংগীত এবং মুদ্রণপ্রযুক্তি নিয়েও কাজ করতেন। স্বাভাবিকভাবেই ছোটবেলা থেকে সুকুমারের মধ্যে নানা বিষয়ে জানার আগ্রহ তৈরি হয়েছিল।
রায় পরিবারের সঙ্গে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরসহ তৎকালীন বাংলার বহু বিশিষ্ট ব্যক্তির যোগাযোগ ছিল। এই পরিবেশ তাঁর চিন্তাভাবনা ও সৃজনশীলতাকে সমৃদ্ধ করেছিল বলে মনে করা হয়।
তাঁর ভাইবোনদের মধ্যেও সাহিত্য ও সংস্কৃতির প্রতি আগ্রহ দেখা যায়। তাঁদের মধ্যে সুখলতা রাও পরবর্তীকালে শিশুসাহিত্যিক হিসেবে পরিচিতি লাভ করেন।
পাঠকদের পছন্দের আরও কিছু লেখা – সঞ্জীব চট্টোপাধ্যায়ের জীবনী
শিক্ষাজীবন, Sukumar Ray Educational Qualification and Early Life
সুকুমার রায়ের পড়াশোনা শুরু হয় কলকাতায়। তিনি সিটি স্কুল থেকে প্রবেশিকা পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হন। এরপর প্রেসিডেন্সি কলেজে ভর্তি হয়ে রসায়ন ও পদার্থবিদ্যা নিয়ে পড়াশোনা করেন। ১৯০৬ সালে তিনি রসায়নে অনার্সসহ বি.এসসি. ডিগ্রি লাভ করেন।
বিজ্ঞান নিয়ে পড়াশোনা করলেও তাঁর আগ্রহ শুধু পাঠ্যবইয়ের মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল না। সাহিত্য, ছবি আঁকা, ফটোগ্রাফি এবং নানা ধরনের সৃজনশীল কাজ তাঁকে সমানভাবে আকর্ষণ করত।
১৯১১ সালে তিনি উচ্চশিক্ষার জন্য ইংল্যান্ডে যান। সেখানে আলোকচিত্র ও মুদ্রণপ্রযুক্তি নিয়ে পড়াশোনা করেন। বিশেষ করে হাফটোন ব্লক তৈরির প্রযুক্তি সম্পর্কে তাঁর আগ্রহ ছিল গভীর। পরবর্তীকালে এই জ্ঞান তাঁর সাহিত্য ও প্রকাশনাসংক্রান্ত কাজেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।
১৯১৩ সালে দেশে ফিরে তিনি পারিবারিক ছাপাখানা এবং সন্দেশ পত্রিকার সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে যুক্ত হন।
সাহিত্যজীবনের সূচনা, Sukumar Ray Literary Career
সুকুমার রায়ের সাহিত্যিক প্রতিভার বিকাশ ঘটেছিল ছোটবেলা থেকেই। তবে তাঁর লেখার স্বাতন্ত্র্য সবচেয়ে স্পষ্ট হয়ে ওঠে প্রেসিডেন্সি কলেজে পড়ার সময়। সেই সময় তিনি বন্ধুদের নিয়ে গড়ে তোলেন ‘ননসেন্স ক্লাব’। ক্লাবের সঙ্গে যুক্ত ছিল সাড়ে বত্রিশ ভাজা নামে একটি পত্রিকা।
নামটি শুনলেই বোঝা যায়, সাধারণ নিয়মের বাইরে গিয়ে মজা করার প্রবণতা এই গোষ্ঠীর মধ্যে কতটা ছিল! এই পরিবেশে সুকুমার রায়ের হাস্যরসাত্মক লেখা ও অদ্ভুত কল্পনার চর্চা আরও জমে ওঠে।
ইংল্যান্ড থেকে ফিরে তিনি সন্দেশ পত্রিকার কাজে মন দেন। তাঁর বাবা উপেন্দ্রকিশোর রায়চৌধুরী পত্রিকাটি প্রকাশ করেছিলেন। বাবার মৃত্যুর পর সুকুমার এর সম্পাদনার দায়িত্ব গ্রহণ করেন। পরবর্তী কয়েক বছর ধরে তিনি পত্রিকাটিকে সমৃদ্ধ করেন নিজের লেখা ছড়া, গল্প, প্রবন্ধ ও ছবির মাধ্যমে।
সন্দেশ তাঁর সৃষ্টিশীলতার অন্যতম প্রধান ক্ষেত্র হয়ে উঠেছিল। ছোটদের জন্য ভালো লেখা প্রকাশের পাশাপাশি তিনি নিজেও নিয়মিত লিখতেন। তাঁর লেখায় যেমন ছিল নির্মল হাস্যরস, তেমনই ছিল ভাষার ওপর অসাধারণ দখল এবং কল্পনাকে নতুনভাবে ব্যবহার করার ক্ষমতা।
এই ধরনের আরও লেখা খুঁজছেন? পড়ুন: চলচ্চিত্রের রূপকার সত্যজিৎ রায়ের জীবনী
সুকুমার রায়ের সাহিত্যরীতি ও লেখার বৈশিষ্ট্য, Sukumar Ray Writing Style and Literary Characteristics
সুকুমার রায়ের লেখার সবচেয়ে বড় বৈশিষ্ট্য তাঁর অসাধারণ কল্পনাশক্তি। তিনি পরিচিত শব্দকে এমনভাবে সাজাতেন, যা আগে কখনও ভাবা হয়নি। তাঁর গল্পে অদ্ভুত সব চরিত্র আসে, অসম্ভব ঘটনা ঘটে, আর পরিচিত যুক্তির নিয়ম বারবার ভেঙে যায়।
তাঁর এই সাহিত্যধারাকে বলা হয় ‘ননসেন্স সাহিত্য’। তবে নাম শুনে একে নিছক অর্থহীন লেখা মনে করলে ভুল হবে। তাঁর ছড়া ও গল্পের মধ্যে হাসির উপাদান থাকলেও অনেক ক্ষেত্রেই সমাজের প্রচলিত রীতি, মানুষের ভণ্ডামি এবং অন্ধ অনুকরণের প্রতি সূক্ষ্ম ব্যঙ্গ লুকিয়ে থাকে।
তাঁর লেখার আরেকটি গুণ হলো ভাষার সাবলীল ব্যবহার। শব্দের ধ্বনি, ছন্দ এবং অপ্রত্যাশিত অর্থের মেলবন্ধনে তিনি এমন এক জগৎ তৈরি করেছেন, যা শিশুদের কাছে যেমন আনন্দের, বড়দের কাছেও তেমনই উপভোগ্য।
বাংলা ভাষায় ননসেন্স ছড়াকে জনপ্রিয় ও স্বতন্ত্র সাহিত্যধারা হিসেবে প্রতিষ্ঠা করার ক্ষেত্রে তাঁর অবদান বিশেষভাবে স্মরণীয়।
সুকুমার রায়ের বিখ্যাত সাহিত্যকর্ম, Sukumar Ray Famous Books and Literary Works
সুকুমার রায়ের সাহিত্যসম্ভার খুব বড় না হলেও তার বৈচিত্র্য ও মৌলিকতা অসাধারণ। তাঁর কয়েকটি উল্লেখযোগ্য রচনা সম্পর্কে সংক্ষেপে জেনে নেওয়া যাক।
১. আবোল তাবোল
আবোল তাবোল সুকুমার রায়ের সবচেয়ে জনপ্রিয় রচনাগুলির একটি। বইটিতে রয়েছে অদ্ভুত সব চরিত্র, মজার ছড়া এবং কল্পনার বিচিত্র প্রকাশ। সাধারণ শব্দ ও পরিচিত ধারণাকে তিনি এমনভাবে ব্যবহার করেছেন যে সেগুলি পাঠকের কাছে সম্পূর্ণ নতুন হয়ে ওঠে।
১৯২৩ সালে তাঁর মৃত্যুর অল্প কিছুদিন আগে বইটি প্রকাশিত হয়। আজও বাংলা শিশুসাহিত্যের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ বই হিসেবে আবোল তাবোল সমাদৃত।
২. হ-য-ব-র-ল
হ-য-ব-র-ল বাংলা সাহিত্যের এক অনন্য কল্পনাপ্রধান রচনা। গল্পের ঘটনাগুলি একের পর এক এমনভাবে এগিয়ে যায় যে বাস্তব ও অবাস্তবের সীমারেখা ক্রমশ অস্পষ্ট হয়ে ওঠে।
এখানে যুক্তির অদ্ভুত ব্যবহার, উদ্ভট কথোপকথন এবং বিচিত্র চরিত্রের মাধ্যমে সুকুমার রায় তৈরি করেছেন এক আশ্চর্য জগৎ। বইটি পড়লে হাসি পায় ঠিকই, কিন্তু সেই হাসির মধ্যেই প্রচলিত চিন্তাভাবনা নিয়ে প্রশ্ন করার সুযোগও তৈরি হয়।
৩. পাগলা দাশু
পাগলা দাশু বইয়ের গল্পগুলির কেন্দ্রে রয়েছে দাশু নামের এক ব্যতিক্রমী চরিত্র। তার আচরণ, উপস্থিত বুদ্ধি এবং অপ্রত্যাশিত কাণ্ডকারখানা পাঠককে বারবার অবাক করে।
দাশুর চরিত্রের মধ্যে এক ধরনের স্বাধীন চিন্তা ও প্রচলিত নিয়মকে নিজের মতো করে দেখার প্রবণতা রয়েছে। এই কারণেই চরিত্রটি এতটা জনপ্রিয় হয়ে উঠেছে।
৪. হেশোরাম হুশিয়ারের ডায়েরি
এই রচনায় সুকুমার রায়ের কল্পনাশক্তি ও হাস্যরসের এক চমৎকার পরিচয় পাওয়া যায়। অদ্ভুত অভিজ্ঞতা, বিচিত্র প্রাণী এবং অবিশ্বাস্য ঘটনার বর্ণনা গল্পটিকে আকর্ষণীয় করে তুলেছে।
৫. অবাক জলপান
অবাক জলপান তাঁর উল্লেখযোগ্য হাস্যরসাত্মক নাটকগুলির মধ্যে একটি। কথোপকথনের মজা, পরিস্থিতির অদ্ভুত মোড় এবং চরিত্রগুলির আচরণ এই রচনাকে স্বতন্ত্র করে তুলেছে।
৬. লক্ষ্মণের শক্তিশেল
লক্ষ্মণের শক্তিশেল সুকুমার রায়ের একটি জনপ্রিয় হাস্যরসাত্মক নাট্যরচনা। পরিচিত পৌরাণিক কাহিনিকে হাস্যরসের মোড়কে উপস্থাপন করার ক্ষমতা এখানে বিশেষভাবে লক্ষণীয়।
৭. চলচ্চিত্তচঞ্চরী
এটিও তাঁর উল্লেখযোগ্য নাট্যরচনাগুলির মধ্যে একটি। ভাষার খেলা, নাটকীয়তা এবং হাস্যরসের মাধ্যমে সুকুমার রায় এই রচনায় তাঁর নিজস্ব সাহিত্যিক বৈশিষ্ট্য ফুটিয়ে তুলেছেন।
এ ছাড়াও তাঁর উল্লেখযোগ্য রচনার মধ্যে রয়েছে শব্দকল্পদ্রুম, খাই-খাই, ঝালাপালা, বহুরূপী, ভাষার অত্যাচার এবং বর্ণমালাতত্ত্ব।
প্রবন্ধকার ও সম্পাদক হিসেবে সুকুমার রায়, Sukumar Ray as an Essayist and Editor
সুকুমার রায়কে শুধু ছড়াকার হিসেবে দেখলে তাঁর প্রতিভার একটি বড় অংশ অজানা থেকে যায়। তিনি প্রবন্ধ লিখেছেন, ভাষা ও সাহিত্য নিয়ে ভেবেছেন এবং বিজ্ঞান ও মুদ্রণপ্রযুক্তির বিষয়েও আগ্রহ দেখিয়েছেন।
তাঁর লেখায় যুক্তিবোধ ও পর্যবেক্ষণশক্তির পরিচয় পাওয়া যায়। হাস্যরসের পাশাপাশি তিনি নানা বিষয়কে বিশ্লেষণ করার চেষ্টা করতেন। তাঁর প্রবন্ধ The Spirit of Rabindranath বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। এটি তিনি ‘East West Society’-এর আমন্ত্রণে পাঠ করেছিলেন এবং পরে Quest পত্রিকায় প্রকাশিত হয়।
সন্দেশ পত্রিকার সম্পাদক হিসেবে তাঁর ভূমিকা বাংলা শিশুসাহিত্যের ইতিহাসে গুরুত্বপূর্ণ। পত্রিকাটির মাধ্যমে তিনি ছোটদের জন্য মানসম্মত সাহিত্য, জ্ঞানমূলক লেখা ও সৃজনশীলতার একটি সুন্দর পরিবেশ গড়ে তুলতে সাহায্য করেছিলেন।
এটিও পড়ে দেখুন: মৃণাল সেনের জীবনী
ফটোগ্রাফি ও মুদ্রণপ্রযুক্তিতে অবদান, Sukumar Ray Contribution to Photography and Printing Technology
সাহিত্যের বাইরেও সুকুমার রায়ের আগ্রহ ছিল বিস্তৃত। ফটোগ্রাফি ও মুদ্রণপ্রযুক্তিতে তাঁর বিশেষ দক্ষতা ছিল।
ইংল্যান্ডে থাকাকালীন তিনি ফটোগ্রাফি নিয়ে পড়াশোনা করেন এবং ফটোগ্রাফি-সংক্রান্ত সংগঠনের সঙ্গেও যুক্ত ছিলেন। উন্নত মুদ্রণপ্রযুক্তি সম্পর্কে তাঁর জ্ঞান তাঁকে সেই সময়ের একজন দক্ষ প্রযুক্তিবিদ হিসেবেও পরিচিত করেছিল।
তাঁর বাবা উপেন্দ্রকিশোর রায়চৌধুরী ছাপার ব্লক তৈরির প্রযুক্তি নিয়ে কাজ করেছিলেন। সুকুমারও পারিবারিক প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে যুক্ত থেকে সেই কাজ এগিয়ে নিয়ে যান। ফলে সাহিত্যসৃষ্টি ও প্রযুক্তিগত দক্ষতা তাঁর জীবনে পাশাপাশি চলেছিল।
এই দিকটি মনে রাখা জরুরি, কারণ সুকুমার রায়ের সৃজনশীলতা কেবল লেখার পাতায় সীমাবদ্ধ ছিল না। তিনি শিল্প ও প্রযুক্তির মধ্যেও নিজের আগ্রহের প্রকাশ ঘটিয়েছিলেন।
মিস করবেন না: ওপেনহেইমার এর জীবনী ও বিখ্যাত উক্তি সমূহ
সুকুমার রায়ের ছদ্মনাম, Sukumar Ray Pen Name
সুকুমার রায় তাঁর লেখার ক্ষেত্রে ‘উহ্যনাম পণ্ডিত’ ছদ্মনামটিও ব্যবহার করেছিলেন। বিশেষ করে সন্দেশ পত্রিকার শুরুর দিকের কিছু লেখায় এই নামের উল্লেখ পাওয়া যায়।
তবে তাঁর অধিকাংশ পরিচিত রচনাই সুকুমার রায় নামেই প্রকাশিত হয়েছে।
বিবাহ ও পারিবারিক জীবন, Sukumar Ray Wife and Family Life
সুকুমার রায়ের স্ত্রী ছিলেন সুপ্রভা দেবী। ১৯১৪ সালে তাঁদের বিবাহ হয়। তাঁদের একমাত্র সন্তান সত্যজিৎ রায়, যিনি পরবর্তীকালে ভারতীয় চলচ্চিত্রের ইতিহাসে এক অসামান্য স্থান অধিকার করেন।
দুঃখের বিষয়, সত্যজিৎ রায় যখন মাত্র দুই বছরের শিশু, তখনই তাঁর বাবার মৃত্যু হয়। ফলে বাবার স্নেহ ও সঙ্গ খুব অল্প সময়ের জন্যই পেয়েছিলেন তিনি।
তবু সুকুমার রায়ের সাহিত্যিক উত্তরাধিকার পরবর্তী প্রজন্মের কাছে পৌঁছে যায়। সত্যজিৎ রায় নিজেও তাঁর বাবার জীবন ও কাজের প্রতি গভীর আগ্রহ দেখিয়েছিলেন। ১৯৮৭ সালে তিনি সুকুমার রায়ের জীবন নিয়ে একটি তথ্যচিত্র নির্মাণ করেন।
সুকুমার রায়ের মৃত্যু, Sukumar Ray Death and Cause of Death
১৯২৩ সালের ১০ সেপ্টেম্বর, মাত্র ৩৫ বছর বয়সে সুকুমার রায়ের মৃত্যু হয়। তিনি কালাজ্বরে আক্রান্ত হয়েছিলেন। সেই সময় এই রোগের কার্যকর চিকিৎসা সহজলভ্য ছিল না।
তাঁর মৃত্যু বাংলা সাহিত্যের জন্য ছিল এক অপূরণীয় ক্ষতি। এত অল্প বয়সে একজন লেখক কতটা অসাধারণ সৃষ্টিশীলতার পরিচয় দিতে পারেন, সুকুমার রায় তার উজ্জ্বল উদাহরণ।
তাঁর জীবন থেমে গিয়েছিল, কিন্তু তাঁর সৃষ্টি থেমে থাকেনি। বরং সময়ের সঙ্গে সঙ্গে তাঁর লেখা নতুন পাঠকের কাছে পৌঁছেছে, নতুনভাবে আলোচিত হয়েছে এবং বাংলা সাহিত্যের এক অনিবার্য অংশ হয়ে উঠেছে।
বাংলা সাহিত্যে সুকুমার রায়ের অবদান, Sukumar Ray Contribution to Bengali Literature
সুকুমার রায়ের সবচেয়ে বড় অবদান হলো বাংলা সাহিত্যে ননসেন্স ছড়া ও কল্পনাপ্রধান হাস্যরসকে এক অনন্য উচ্চতায় পৌঁছে দেওয়া। তিনি শিশুদের জন্য এমন সাহিত্য রচনা করেছেন, যা বয়সের গণ্ডি পেরিয়ে সব পাঠকের কাছেই সমান আকর্ষণীয়।
তাঁর লেখা আমাদের শেখায়, কল্পনার কোনো নির্দিষ্ট সীমানা নেই। পরিচিত জগতের বাইরে গিয়েও ভাবা যায়, সাধারণ বিষয়কে নতুন চোখে দেখা যায় এবং হাসির মধ্য দিয়েও গভীর কথা বলা সম্ভব।
তাঁর রচনার আরেকটি বিশেষ দিক হলো, সেগুলি বারবার পড়লেও পুরোনো হয়ে যায় না। ছোটবেলায় যে ছড়া পড়ে আমরা হেসেছি, বড় হয়ে সেই একই লেখায় হয়তো নতুন কোনো ইঙ্গিত খুঁজে পাই।
এটাই একজন প্রকৃত সাহিত্যিকের সার্থকতা। তাঁর সৃষ্টি সময়ের সঙ্গে বদলে যাওয়া পাঠকের কাছেও নতুন অর্থ নিয়ে ফিরে আসে।
উপসংহার, Conclusion
সুকুমার রায়ের জীবন ছিল সংক্ষিপ্ত, কিন্তু তাঁর সৃষ্টির জগৎ ছিল অসীম। মাত্র কয়েক দশকের জীবনে তিনি বাংলা সাহিত্যে এমন এক স্বতন্ত্র ধারা তৈরি করেছিলেন, যা তাঁকে অন্যদের থেকে আলাদা করে রেখেছে।
তাঁর লেখা পড়ে আমরা শুধু হাসতে শিখি না, কল্পনা করতে শিখি, প্রশ্ন করতে শিখি এবং পরিচিত পৃথিবীকে একটু অন্যভাবে দেখতে শিখি। তাঁর চরিত্রগুলি কখনও উদ্ভট, কখনও অদ্ভুত, আবার কখনও আমাদেরই চেনা মানুষের মতো। হয়তো সেই কারণেই এত বছর পরেও তারা আমাদের কাছে এত আপন।
সুকুমার রায় আজ আর আমাদের মধ্যে নেই। কিন্তু আবোল তাবোল, হ-য-ব-র-ল কিংবা পাগলা দাশু খুললেই মনে হয়, তাঁর কল্পনার জগৎ এখনও ঠিক আগের মতোই জীবন্ত। বাংলা সাহিত্যে তাঁর অবদান তাই শুধু অতীতের স্মৃতি নয়; নতুন প্রজন্মের পাঠকদের কাছেও তিনি চিরকাল প্রাসঙ্গিক হয়ে থাকবেন।
সুকুমার রায়ের বিখ্যাত লেখার কিছু অংশ, Famous Writings and Quotes by Sukumar Ray
আম পাকে বৈশাখে
আম পাকে বৈশাখে, কুল পাকে ফাগুণে,
কাঁচা ইট পাকা হয় পোড়ালে তা আগুনে।
কেউ বলেছে খাব খাব
কেউ বলেছে খাব খাব,
কেউ বলেছে খাই
সবাই মিলে গোল তুলেছে –
আমি তো আর নাই।
পাগলা দাশু
অন্ধকারে চৌরাশিটা নরকের কুণ্ড
তাহাতে ডুবায়ে ধরে পাতকীর মুণ্ড—
— পাগলা দাশু, শুকুমার রায়
ট্যাঁশ গরু
ট্যাঁশ গরু গরু নয়, আসলেতে পাখি সে;
যার খুশি দেখে এস হারুদের
হ-য-ব-র-ল
হিজি বিজ্ বিজ্ বলল, “একজনের মাথার ব্যারাম ছিল, সে সব জিনিসের নামকরণ করত। তার জুতোর নাম ছিল অবিমৃষ্যকারিতা, তার ছাতার নাম ছিল প্রত্যুত্পন্নমতিত্ব, তার গাড়ুর নাম ছিল পরমকল্যাণবরেষু- কিন্তু যেই তার বাড়ির নাম দিয়েছে কিংকর্তব্যবিমূঢ় অমনি ভূমিকম্প হয়ে বাড়িটাড়ি সব পড়ে গিয়েছে। হোঃ হোঃ হোঃ হো—।
শিবঠাকুরের আপন দেশে
শিবঠাকুরের আপন দেশে,
আইন কানুন সর্বনেশে।
কেউ যদি যায় পিছলে প’ড়ে,
প্যায়দা এসে পাকড়ে ধরে,
কাজির কাছে হয় বিচার-
একুশ টাকা দণ্ড তার……
সাগর যেথায় লুটিয়ে পড়ে
সাগর যেথায় লুটিয়ে পড়ে নতুন মেঘের দেশে,
আকাশ ধোয়া নীল যেখানে সাগর জলে মেশে।
মেঘের শিশু ঘুমায় সেথা আকাশ-দোলায় শুয়ে,
ভোরের রবি জাগায় তারে সোনার কাঠি ছুঁয়ে।
সোনার আলো
সোনার আলো, রঙিন আলো,
স্বপ্নে আঁকা নবীন আলো-
আয়রে আলো আয়।
আয়রে নেমে আঁধার পরে,
পাষাণ কালো ধৌত করে
আলোর ঝরনায়।
আবোল তাবোল
কেউ যদি যায় পিছলে প’ড়ে,
প্যায়দা এসে পাকড়ে ধরে,
কাজির কাছে হয় বিচার-
একুশ টাকা দন্ড তার।
— Sukumar Ray, Abol Tabol
মাসি গো মাসি
মাসি গো মাসি পাচ্ছে হাসি
নিম গাছেতে হচ্ছে শিম্-
হাতীর মাথায় ব্যাঙের ছাতা
কাগের বাসায় বগের ডিম্ ।।
হে পর্বত
হে পর্বত, যত নদী করি নিরীক্ষণ,
তোমাতেই করে তারা জনম গ্রহণ।
ছোট বড় ঢেউ সব তাদের উপরে
কল কল শব্দ করি সবে ক্রীড়া করে,
নদী বেঁকে চুরে যায় দেশে দেশে,
সাগরেতে পড়ে গিয়া সকলের শেষে।
পড়তে বসে
পড়তে বসে মুখের পরে
কাগজ খানি থুয়ে
রমেশ ভায়া ঘুমোয় পড়ে
আরাম ক’রে শুয়ে।
অন্ধ মেয়ে
অন্ধ মেয়ে দেখছে না তা— নাই-বা যদি দেখে—
শীতল মিঠা বাদল হাওয়া যায় যে তারে ডেকে!
শুনছে সে যে পাখির ডাকে হরষ কোলাকুলি
মিষ্ট ঘাসের গন্ধে তারও প্রাণ গিয়েছে ভুলি!
দুঃখ সুখের ছন্দে ভরা জগৎ তারও আছে,
তারও আঁধার জগৎখানি মধুর তারি কাছে।
Frequently Asked Questions
সুকুমার রায়ের জন্ম ৩০ অক্টোবর ১৮৮৭ সালে কলকাতায়। তিনি ১০ সেপ্টেম্বর ১৯২৩ সালে মাত্র ৩৫ বছর বয়সে মারা যান।
সুকুমার রায়ের বাবার নাম উপেন্দ্রকিশোর রায়চৌধুরী। তিনি ছিলেন একজন বিশিষ্ট শিশুসাহিত্যিক, চিত্রকর, প্রকাশক এবং মুদ্রণপ্রযুক্তিবিদ।
তিনি কলকাতার প্রেসিডেন্সি কলেজে পড়াশোনা করেন। ১৯০৬ সালে রসায়ন ও পদার্থবিদ্যায় অনার্সসহ বি.এসসি. ডিগ্রি অর্জন করেন।
১৯১১ সালে সুকুমার রায় মুদ্রণপ্রযুক্তি ও আলোকচিত্র সম্পর্কে উচ্চতর শিক্ষা ও প্রশিক্ষণ নিতে ইংল্যান্ডে যান। ১৯১৩ সালে তিনি কলকাতায় ফিরে আসেন।
সুকুমার রায়ের বিখ্যাত ছড়ার বই আবোল তাবোল। বইটি ১৯২৩ সালে তাঁর মৃত্যুর অল্প কিছুদিন আগে প্রকাশিত হয়।
আবোল তাবোল তাঁর প্রথম ও একমাত্র ননসেন্স ছড়ার বই। এতে ভাষার খেলা, উদ্ভট চরিত্র ও কল্পনার অভিনব প্রকাশ দেখা যায়।
সুকুমার রায় তাঁর বাবা উপেন্দ্রকিশোর রায়চৌধুরীর প্রতিষ্ঠিত সন্দেশ পত্রিকার সম্পাদনার দায়িত্ব পালন করেন। তাঁর সম্পাদনায় পত্রিকাটি বাংলা শিশুসাহিত্যের একটি গুরুত্বপূর্ণ মঞ্চ হয়ে ওঠে।
কলেজে পড়ার সময় তিনি বন্ধুদের নিয়ে ‘ননসেন্স ক্লাব’ গড়ে তোলেন। এই ক্লাবের সঙ্গে সাড়ে বত্রিশ ভাজা নামে একটি পত্রিকা যুক্ত ছিল। পরবর্তীকালে তিনি ‘মানডে ক্লাব’ও প্রতিষ্ঠা করেন।
সুকুমার রায়ের একটি পরিচিত ছদ্মনাম ছিল ‘উহ্যনাম পণ্ডিত’। তিনি কিছু লেখায় এই নাম ব্যবহার করেছিলেন।
তাঁর উল্লেখযোগ্য রচনাগুলির মধ্যে রয়েছে আবোল তাবোল, হ-য-ব-র-ল, পাগলা দাশু, হেশোরাম হুশিয়ারের ডায়েরি, অবাক জলপান, লক্ষ্মণের শক্তিশেল এবং চলচ্চিত্তচঞ্চরী।

