গুরু নানক এর জীবনী, Best biography about Guru Nanak in Bengali 



প্রাথমিক পরিচয়, Initial identification

গুরু নানক দেব এর নাম ছোটবেলা থেকেই আমরা জেনেছি, শিখ ধর্মের প্রবক্তা এবং উক্ত ধর্মের প্রথম গুরু হিসেবে গুরু নানক প্রাথর স্মরণীয় এক ব্যক্তিত্ব । প্রতি বছরই কার্তিক পূর্ণিমার তিথিতে নানকের জন্মোৎসব পালন করা হয়। গুরু নানক বিভিন্ন স্থানে ভ্রমণ করে জনগণের মধ্যে এক ঈশ্বরের মতবাদ প্রচলন করেছিলেন।

গুরু নানক এর জীবনী

তিনি ভ্রাতৃত্ব ও সদাচরণ তথা সমতার ওপর নির্ভর করে এক অনন্য ধর্মীয় তথা সামাজিক এবং রাজনৈতিক ব্যবস্থার প্রচলন করতে সক্ষম হয়েছিলেন। শিখ ধর্মাবলম্বীদের বিশ্বাস অনুযায়ী, একের পর এক শিখ গুরুদের গুরুপদ লাভের সময়কালে তাদের মধ্যে নানকের ঐশ্বরিক ক্ষমতা, ধর্মীয় কর্তৃত্ব এবং পবিত্রতা প্রবাহিত হয়।

গুরু নানকের জন্ম, Birth of Guru Nanak

 শিখ ধর্মগুরু নানকের জন্ম হয়েছিল ১৪৬৯ সালে। বর্তমানে পাকিস্তানের অন্তর্ভুক্ত তৎকালীন পশ্চিম পাঞ্জাবের লাহোরের নিকটস্থ তালওয়ান্দি গ্রামে তিনি জন্মগ্রহণ করেন। বর্তমানে উক্ত স্থানটি পাকিস্তানের নানকানা সাহিব নামে পরিচিত। নানকের জন্মস্থানে বর্তমানে শিখদের এক বৃহৎ উপাসনালয় আছে। উপাসনালয়টির নাম রাখা হয়েছিল ‘গুরুদুয়ারা জনম আস্থান’।

গুরু নানকের জন্ম

ডোনাল্ড ট্রাম্প এর জীবনী, Best ever biography of President Donald Trump in Bengali 

নানকের পিতামাতা ও পরিবার, Nanak’s parents and family

 গুরু নানকের পিতার নাম ছিল মেহেতা কল্যাণ দাস বেদী, তবে নিজ গ্রামে তিনি মেহেতা কালু নামে অধিক পরিচিত ছিলেন। নানকের মাতার নাম ছিল ত্রিপতা। মেহেতা কালু পেশাগত দিক থেকে ছিলেন একজন  চাষী, তাছাড়াও তিনি এক মুসলমান রাজপুত জমিদারের সম্পত্তি তদারক করার কাজেও নিযুক্ত ছিলেন। 

নানকের পিতামাতা ও পরিবার

মার্কিন প্রেসিডেন্ট আব্রাহাম লিংকনের জীবনী, Best Biography of US President Abraham Lincoln in Bengali 

নানকের শৈশবকাল, Childhood of Guru Nanak 

 শিখ ধর্মগুরু নানকের মধ্যে বাল্যকাল থেকেই প্রবল আধ্যাত্মিক ভাবের প্রকাশ পরিলক্ষিত হয়। সমবয়সী ছেলে মেয়েরা যখন বাইরে খেলা করতো, তখন নানককে নির্জনে একাকী বসে থাকতে দেখা যেত। 

তাঁর মধ্যে সর্বদাই কেমন একটা উদাসভাব ছিল। জীবন তথা জন্ম মৃত্যু ইত্যাদি বিষয়ে মনীষী বা সাধুদের গূঢ় আলোচনাগুলো মগ্ন হয়ে শুনতেন তিনি। ছেলের এমন অবস্থা নিয়ে পিতামাতার দুশ্চিন্তা হওয়াই স্বাভাবিক ছিল। পিতা মেহেতা কালু আর মাতা ত্রিপতার মনেও এ নিয়ে শান্তি ছিল না। তাদের একমাত্র সন্তান এমন আত্মভোলা হয়ে ঘুরে বেড়াচ্ছে, এটা দেখতে তাদের একদমই ভালো লাগছিল না।

নানকের শৈশবকাল

মার্কিন প্রেসিডেন্ট বিল ক্লিনটনের জীবনী, Best biography of Bill Clinton in Bengali

ধর্ম প্রচারে গুরু নানক দেবের সংসার ত্যাগ, Guru Nanak left his family to preach religion

শিখ ধর্মগুরু নানক গ্রামের পাঠশালায় অল্প সময়ের জন্য লেখাপড়া করেছিলেন, এরপর তিনি প্রথমে স্থানীয় এক জমিদারীতে কেরানির কাজ শুরু করে দেন। কিছু সময় পর তিনি সুলক্ষ্মণী নামক এক নারীকে বিবাহ করেন। পরবর্তী তাদের দুই সন্তানের জন্ম হয়। তাঁর দুই পুত্রের নাম হল শ্রীচান্দ এবং লক্ষ্মীচান্দ।

কিন্তু এই সংসার বেশি দিন স্থায়ী হয় নি, সময়ের সাথে সাথে সংসারের প্রতি নানকের উদাসীনতাও বাড়তে থাকে। প্রায়ই তিনি নির্জনে ধ্যানস্থ হয়ে বসে থাকতেন। একসময় তিনি স্ত্রীপুত্রদের ত্যগ করে সত্যের সন্ধানে বেরিয়ে পড়েন এবং নানা জায়গায় ভ্রমণ করতে শুরু করেন। এইভাবে নানক ঈশ্বরের স্বরূপ অনুধাবন করতে সক্ষম হন।

ধর্ম প্রচারে গুরু নানক দেবের সংসার ত্যাগ

এর পর থেকে তিনি ঈশ্বরের বাণী প্রচারের কাজ শুরু করেন। ধর্ম প্রচারে তিনি বলেন যে “ঈশ্বর কেবল একজনই, তিনিই সত্য, তিনিই স্রষ্টা, তাঁর ভয় নেই, তাঁর ঘৃণা নেই, তিনি কখনও বিলীন হন না, তিনি জন্ম-মৃত্যু চক্রের উর্দ্ধে, তিনি অজ-অমর স্বয়ংপ্রকাশ। সাধনার দ্বারা প্রকৃত গুরুর মাধ্যমেই তাঁকে অনুধাবন করা যায়। তিনি আদিতে সত্য ছিলেন, তিনি কালের সূচনায় সত্য ছিলেন, চিরকালব্যাপী সত্য আছেন এবং তিনি এখনও সত্য।”

ফ্র্যাংকলিন রুজভেল্টের জীবনী, Best Biography of Franklin Roosevelt in Bengali

নানা দেশে ধর্ম প্রচার, Propagation of religion in different countries

নানক বিভিন্ন দেশে ঘুরে ধর্ম প্রচার করতে শুরু করেন। তিনি তাঁর বাণী প্রচারের জন্য বিভিন্ন স্থান পরিভ্রমণকালে, ‘রাবাব’ নামক এক প্রকার বাদ্যযন্ত্রের বাদক তথা তাঁর মুসলমান বন্ধু মারদানাকে সঙ্গে নিয়েছিলেন। প্রথমে তিনি ভারতবর্ষের অধিকাংশ অঞ্চল ভ্রমণ করে ধর্ম প্রচার করেন। পরবর্তীকালে ভারতের বাইরের বিভিন্ন স্থান যথা আরবের মক্কা, মদিনা, শ্রীলঙ্কা, বাগদাদ প্রভৃতি নানা স্থানের স্থানীয় ভাষায় রাবাব বাদনের ছন্দে ধর্মীয় বাণী প্রচার করেন। বিভিন্ন স্থানে পরিভ্রমণকালে ধর্মমত প্রচারের জন্য প্রচারকেন্দ্র বা মানজিস স্থাপন করেছিলেন।

নানা দেশে ধর্ম প্রচার

মোঘল রাজত্বকালে নানকের ধর্ম প্রচারে বাঁধা সৃষ্টি, Hindrance of Guru nanak’s religion during Mughal Reign 

গুরু নানকের ধর্মপ্রচারকালীন সময় ছিল মোঘল সম্রাট বাবরের রাজত্বকাল। তখন নানক এবং তাঁর মুসলমান বন্ধু মারদানাকে বাবরের কারাগারে অন্তরীণ করে দেওয়া হয়। তবে কারাগারের কর্মকর্তার মাধ্যমে গুরু নানক সম্পর্কে অবগত হবার পর সম্রাট বাবর তাঁকে দরবারে ডেকে পাঠান এবং তাঁর থেকে ধর্মবাণী শুনে তাঁকে বিশেষ ধর্মীয় জ্ঞানসম্পন্ন ব্যক্তি বলে মনে করেন এবং মুক্ত করে দেন।

দয়ার প্রতিভু ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগরের জীবনী – Ishwar Chandra Vidyasagar Biography in Bengali

নানক- ঈশ্বর প্রেরিত গুরু, Divinity of Guru Nanak 

১৫৩৯ সালের ৭ই মে, বর্তমান ভারতের অন্তর্গত পাঞ্জাব প্রদেশের করতারপুরে নানক হঠাৎ নিরুদ্দেশ হয়ে যান। শিখদের মধ্যে কথিত আছে যে, একদিন নানক তাঁর বন্ধু মারদানার সঙ্গে বাইন নদীতে স্নান করতে যান, সেখানে ডুব দিয়েই হারিয়ে যান তিনি। তখন স্থানীয় লোকজন সহ অনেক খোঁজাখুঁজি করার পরও তাঁর কোনো খোঁজ পাওয়া যায় নি। এই ঘটনার তিনদিন পর নানক আবার সবার সামনে উপস্থিত হন এবং বলেন, “আমি ঈশ্বরের দেখা পেয়েছি, তিনি আমাকে তাঁর প্রেরিত গুরু হিসাবে উল্লেখ করেছেন”।

নানক- ঈশ্বর প্রেরিত গুরু

স্বামী বিবেকানন্দের জীবনী ও বাণী সমূহ | Vivekananda Quotes Bangla

শিখ ধর্মের প্রবর্তন, Introduction of Sikhism

 প্রায় পঁচিশ বছরব্যাপী, অর্থাৎ দীর্ঘসময় ধরে গুরু নানক বিভিন্ন দেশ ভ্রমণ করেছিলেন। তবে নানক সর্বদাই হিন্দু ও মুসলমানের ঐক্যের প্রতি বিশেষ জোর দিতেন। তিনি ইসলাম এবং হিন্দু ধর্মের মূল তথা প্রয়োজনীয় সকল উপদেশগুলো গ্রহণ করেন এবং এক নতুন ধর্ম প্রবর্তন করেন। গুরু নানক নিজ প্রবর্তিত এই নতুন ধর্মের নাম দেন শিখ ধর্ম।

উক্ত শিখ ধর্মের মূল দর্শনই হল ভালোবাসা এবং সাম্য৷ উপদেশ অনুযায়ী নানক প্রবর্তিত শিখ ধর্মের অনুসারীগণ চুল এবং দাড়ি কাটেন না। হাতে বালা পরে থাকেন এবং মাথায় সর্বদা পাগড়ি বেঁধে রাখেন। নানক তাঁর অনুসারীদের কাছে যে উপদেশামৃত এবং মহামূল্যবান বাণী বিতরণ করতেন, সেই সকল উপদেশাবলী তথা বাণীর সংকলিত রূপ হল ‘ গুরু গ্রন্থসাহেব ’। এটি শিখদের মহাপবিত্র ধর্মগ্রন্থ হিসাবেও বিবেচিত হয়।

শিখ ধর্মের প্রবর্তন

ঠাকুর রামকৃষ্ণ পরমহংস দেবের অমৃত বাণী | Ramkrishna Paramhans Quotes in Bengali With PDF Download

লঙ্গরের প্রচলন, Prevalence of Langar

গুরু নানক নিজের সময়কালে লঙ্গরের প্রচলন করেন। সেখানে সব ধর্ম নির্বিশেষে, সকল গোত্রের, সকল লিঙ্গের, তথা সমাজের সর্ব স্তরের মানুষ পাশাপাশি বসে থেকে আহার করেন। নানকের সময়ে আমিষ আহার প্রচলিত থাকলেও দ্বিতীয় শিখগুরু অঙ্গদ দেবের সময়কাল থেকে লঙ্গরে মাংসের ব্যবহার সম্পূর্ণভাবে বাতিল করে দেওয়া হয়। সে সময় থেকেই লঙ্গরে শুধু নিরামিষ আহার বিতরণ শুরু করা হয়। ঐতিহাসিকদের মত অনুসারে বৈষ্ণবদেরকে সম্পৃক্ত করার উদ্দেশ্যেই এই ব্যবস্থাটির প্রচলন করা হয়েছিল।  বর্তমান সময়ে দেশ বিদেশের প্রতিটি গুরদুয়ারাতেই লঙ্গরের ব্যবস্থা রয়েছে।

লঙ্গরের প্রচলন

করুণাময়ী শ্রীশ্রী মা সারদার জন্ম বৃত্তান্ত ও জীবনী, Biography of Shri Shri Maa Saroda in Bangla

স্বর্ণমন্দিরের প্রতিষ্ঠা, Establishment of the Golden Temple

১৫০২ সালের একটা সময়ে গুরুনানক একটি মন্দির গড়ে তোলার স্বপ্ন দেখেছিলেন। স্বপ্নে দেখা স্থানটি লাহোর থেকে প্রায় ২৫ কিলোমিটার দূরে জি টি রোডের নিকটবর্তী এক প্রকাণ্ড জলাশয়ের ধারে ছিল।

এই সময় নানক উক্ত জলাশয়ের নাম রেখেছিলেন অমৃত সায়র। সেই থেকেই ওই শহরের নাম হয় অমৃতসর। যদিও গুরু নানকের জীবদ্দশায় তাঁর এই স্বপ্নটি বাস্তবায়িত হয় নি। তবে পরবর্তীতে শিখ গুরু অর্জুন সিং ১৫৮৮ সালে এই অমৃত সায়র-এর ধারে স্বর্ণ মন্দিরের ভিত্তি প্রস্তর স্থাপন করেছিলেন। শিখদের ধারণা অনুযায়ী বর্তমানে অমৃতসরের স্বর্ণমন্দির বা হরিমন্দিরে প্রতিদিন প্রায় ১ লক্ষের চেয়েও বেশি দর্শনার্থীকে খাবার দেওয়া হয়।

স্বর্ণমন্দিরের প্রতিষ্ঠা

এই গুরুদুয়ারায় থাকা লঙ্গরটি বিভিন্ন মানুষের দানেই চলে। লঙ্গরটির নাম রাখা হয়, ‘গুরু কা লঙ্গর’, আর যাঁদের স্বেচ্ছাশ্রমে বিভিন্ন গুরুদুয়ারার লঙ্গরগুলো চলে, তাঁদেরকে ‘সেবাদার’ বলা হয়।

সন্ত কবীর ও তার অমূল্য দোহা ~ Top 125+ Kabir’s Doha in Bengali | Kabir er Doha Collection

গুরু নানক এর মৃত্যু, Death of Guru Nanak 

 শিখ ধর্মের গুরু নানক ১৫৩৯ সালের ২২ শে সেপ্টেম্বর ৭০ বছর বয়সে এই পৃথিবীর সকল মায়া কাটিয়ে অনন্তধামে যাত্রা করেন। তৎকালীন মুঘল সাম্রাজ্য কর্তারপুরে তিনি মৃত্যুবরণ করেন, যা বর্তমানে পাকিস্থানের অন্তর্গত। তাঁর সমাধিস্থল হলগুরুদ্বারা দরবার সাহেব, যা পাকিস্তানের কর্তারপুরে অবস্থিত।

উপসংহার, Conclusion 

সৎ তথা নিরাসক্ত জীবনযাপনই ছিল নানকের ধর্ম বিশ্বাসের মূল কথা। অন্যদিকে হিন্দু-মুসলমানের মধ্যে সুসম্পর্ক ও ভালোবাসা সৃষ্টিই ছিল তাঁর জীবনের মূল উদ্দেশ্য। মৃত্যুর পূর্ব অবধি খ্যাতির উচ্চশিখরে আহরণ করেছিলেন তিনি। বর্তমানে নানকের শিষ্যরা শিখ নামে পরিচিত।

বর্তমানে নানকের শিষ্যরা শিখ নামে পরিচিত।

Frequently Asked Questions

গুরু নানক কে ছিলেন ?

গুরু নানক ছিলেন শিখ ধর্মের প্রবর্তক ।

গুরু নানক এর জন্ম কোথায় হয় ?

গুরু নানক এর জন্ম হয় তালবন্দী, পাঞ্জাব ।

গুরু নানক এর জন্ম কবে হয় ?

 গুরু নানক এর জন্ম ১৫ এপ্রিল ১৪৫৯ সালে হয়।

গুরু নানক এর পিতার নাম কী ?

গুরু নানক এর পিতার নাম মেহেতা কালু ।

গুরু নানক এর মাতার নাম কী ?

গুরু নানক এর মাতার নাম মেহেতা ত্রিপতা ।

গুরু নানক এর স্ত্রীর নাম কী ?

গুরু নানক এর স্ত্রীর নাম মাতা সুলাক্ষণী।

শিখদের ধর্ম গ্রন্থের নাম কী ?

 শিখদের ধর্ম গ্রন্থের নাম ‘গুরু গ্রন্থসাহেব’।

গুরু নানক কবে মারা যান ?

গুরু নানক  মারা যান ২২ সেপ্টেম্বর ১৫৩৯ সালে।

Recent Posts