ভারতীয় আধ্যাত্মিক ইতিহাসে এমন কিছু মহাজীবন আছেন, যাঁদের পরিচয় একক শব্দে ধরা যায় না। একটি অবয়বের মধ্যেই বহমান ছিল অসংখ্য ভাবধারা—এই বিরল সমন্বয়ই পরমহংস মহর্ষি নগেন্দ্রনাথ ভাদুড়ীর মহাজীবন। (৬ ডিসেম্বর ১৮৪৬ – ২ নভেম্বর ১৯২৬)। তিনি ভাদুড়ী মহাশয় নামেও সমধিক পরিচিত। একজন সিদ্ধ যোগী, গভীর সাধক এবং আধ্যাত্মিক মহিমায় ঋদ্ধ এক মহাপুরুষ হিসেবে তাঁর নাম ভারতীয় যোগধারায় চিরস্মরণীয়।
যোগী শ্যামাচরণ লাহিড়ীর মতোই তাঁর নামের সঙ্গে ‘মহাশয়’ উপাধি যুক্ত হয়েছিল—যা কেবল সম্মান নয়, সাধনার স্বীকৃতিও বটে। কাশীর সুমেরু মঠাধীশ শংকরাচার্যসহ বহু ধর্মপ্রচারক তাঁকে ‘মহর্ষি’ উপাধিতে ভূষিত করেন। তাঁরাই তাঁর পরমহংস অবস্থা স্বীকার করে নেন। বিশ্বখ্যাত যোগগুরু পরমহংস যোগানন্দ তাঁকে তাঁর গ্রন্থ Autobiography of a Yogi-তে “ভাদুড়ী মহাশয়” নামেই উল্লেখ করেছেন এবং এই গ্রন্থটির সপ্তম অধ্যায় – The Levitating Saint তাঁকেই নিবেদিত।
১৮৮১ সালে শ্রীশ্রীরামকৃষ্ণ পরমহংসের সঙ্গে তাঁর সাক্ষাৎ ঘটে—যার উল্লেখ পাওয়া যায় Companions and Followers of Ramakrishna গ্রন্থে। এছাড়াও সনন্দলাল ঘোষের Mejda এবং শ্রীশ্রীনগেন্দ্র মঠ-সম্পর্কিত বিভিন্ন গ্রন্থে তাঁর জীবনের নানা অলৌকিক ও গভীর আধ্যাত্মিক ঘটনার বিবরণ ছড়িয়ে রয়েছে। এইসব দলিল ও স্মৃতির মধ্য দিয়ে আমরা আজও অনুভব করি—নগেন্দ্রনাথ ভাদুড়ী শুধুই একজন যোগী নন, তিনি ভারতীয় কৃষ্টি ও আধ্যাত্মিক চেতনায় এক জীবন্ত সেতু।
মহর্ষি নগেন্দ্রনাথ ভাদুড়ীর বাণীগুলি ছিল অত্যন্ত সহজ, কিন্তু অর্থে গভীর। বাহ্যিক আড়ম্বর নয়, অন্তরের শুদ্ধতা, সংযম ও আত্মসচেতনতার উপরই তিনি সর্বাধিক গুরুত্ব দিয়েছেন। তাঁর উক্তিগুলিতে যেমন আছে যোগসাধনার সূক্ষ্ম তত্ত্ব, তেমনি আছে দৈনন্দিন জীবনে প্রযোজ্য মানবিক ও নৈতিক শিক্ষা।
নিম্নে তাঁর কিছু নির্বাচিত উক্তি ও বাণী তুলে ধরা হলো—যেগুলি আজও আত্মঅনুসন্ধানী মানুষের কাছে পথপ্রদর্শকের মতো কাজ করে।
পরমহংস মহর্ষি নগেন্দ্রনাথ ভাদুড়ীর নির্বাচিত উক্তি, Selected Quotations of Paramahamsa Maharshi Nagendranath Bhaduri
- ধর্ম তো কতকগুলি আচার আচরণের সমষ্টি নয়। ভগবানই ধর্ম। আচার আচরণগুলি তাঁকে সদা সর্বদা স্মরণ করিয়ে দেয় বলেই গৌণভাবে আচার, আচরণকে ধর্ম বলে। ভগবান সর্বব্যাপী, সর্বান্তর্যামী, কোনও সময়ে তাঁর থেকে আমাদের বিচ্ছেদ নাই।
- ভক্তের যখন আকুতি জাগে, ব্যাকুলতা বাড়ে, তখন দয়ালু ভগবান কৃপা করে গুরুমূর্তিতে আবির্ভূত হয়ে কৃপা করে নিজেকে নিজে দেখান।
- ভগবান তো আড়ম্বর দেখেন না, দেখেন মন। বাইরের লোককে আড়ম্বর দিয়ে ভোলানো যায়। কিন্তু যিনি অন্তর্যামী, যিনি সর্বব্যাপী তাঁর কাছে তো লুকোবার উপায় নাই।
- যদি প্রাণের সঙ্গে নামের যোগ স্থাপন করতে পার তবে জীবনের প্রতিক্ষণে শ্বাসপ্রশ্বাসের সঙ্গে নামের সঙ্গ হবে, এবং সঙ্গে সঙ্গে নামীর সহিত সঙ্গ হবে। নাম ও নামী অভিন্ন কিনা!
- তোমাদের ভক্তি থাকে, তা দিয়ে নাম করো, ভক্তি না থাকে অভক্তিতেও তাঁকে ডাকতে চেষ্টা করো। ডাকা ছেড়ো না, ডাকতে ডাকতে তোমাদের ব্যাকুলতা বাড়বে। ব্যাকুলতা দেখে ভগবান আর দূরে থাকতে পারবেন না।
- নিত্য সদ্গ্রন্থ পড়বে, জীবনে ফুটিয়ে তোলার চেষ্টা করবে। যে গ্রন্থে বা শাস্ত্রে ভগবানের গুণানুবাদ নেই তা শব সদৃশ। গ্রন্থ সঙ্গ অপেক্ষা নাম আরও ভাল সঙ্গী।
- সংসার ধর্ম সংসরণশীল ধর্ম যা স্থান, কাল, পাত্র অনুযায়ী ভিন্ন ভিন্ন। প্রকৃত ধর্ম, যা ধারণ করে আছে, বা যাকে আশ্রয় করে জীব সংসারে থাকে সে ধর্ম ভগবান। সত্যধর্মে ভগবানে পৌঁছতে হলে সকল ব্যবহারের অতীত হয়ে তাঁকে একান্তভাবে আশ্রয় করতে হবে।
- পারের উপায় হবেই। নিশ্চয়ই হবে। আজ হোক, কাল হোক আর জন্মান্তরে হোক হবেই। যাদের যেমন আগ্রহ, ঠকবে কিন্তু কখনও কাউকে ঠকাবে না।
পরমহংস মহর্ষি নগেন্দ্রনাথ ভাদুড়ীর নির্বাচিত উক্তি ও বাণী সংক্রান্ত আমাদের আজকের এই পোস্টটি ভালো লেগে থাকলে আশা করি ঠাকুর রামকৃষ্ণ পরমহংস দেবের অমৃত বাণী সম্পর্কিত আমাদের এই পোস্টটি ও আপনার মনের মতন হবে।
পরমহংস মহর্ষি নগেন্দ্রনাথ ভাদুড়ীর চিরস্মরণীয় উক্তিসমূহ, Timeless Sayings of Paramahamsa Maharshi Nagendranath Bhaduri
- বিশ্বাস রাখ হবেই। বিশ্বাস বড় দুর্লভ জিনিস। কিন্তু ব্যবসায়ী বুদ্ধি ভাল নয় এতটুকু করেছি, এতটুকু হল না যখন, তখনও হয় না। শাস্ত্র বা সাধুসন্তরা ধাপ্পা দিয়েছে-এমন ভেবো না।
- শুদ্ধ মনে ভগবানের মহিমা প্রকাশ পায়। যেমন মলিন দর্পণে প্রতিবিম্ব ভাল দেখা যায় না, পরিস্কার স্বচ্ছ দর্পণে বিশ্ব সুন্দররূপে প্রতিবিম্বিত হয়। তেমনি চিত্ত দর্পণ যার যতটুকু পরিস্কার আসক্তি, তাদের তেমনই হবে।
- হতাশ হয়ো না, হবেই। হচ্ছে না, হবে না বলে হতাশ হয়ো না। সবদিকে সুতীক্ষ্ণ দৃষ্টি রেখে এগুতে থাকো একদিন হবেই। কিছুই বিফলে যায় না, ‘Be slow but sure’। ধীরে চলো লক্ষ্যের পথে এগোও। লক্ষ্য ঠিক থাকলে লক্ষ্যহারা হবে না।
- সকল সময় চেষ্টা করবে কেউ যেন তোমার দ্বারা প্রভাবিত না হয় এবং তুমিও প্রতারিত না হও, বরং তুমি তার হৃদয়ে তত্ত্ব ততটুকুই প্রতিভাত হয়।
- উপাসনা চাই, বিশ্বাস চাই, চাই নির্ভরতা। আমাদের প্রার্থনা যেন আন্তরিক হয়, উদ্দেশ্য সিদ্ধির জন্য যেন নাছোড়বান্দা হই। তবে আমরা ত ত্রিকালজ্ঞ নই, সর্বজ্ঞও নই, সত্যকার কল্যাণ কিসে হবে, তাও জানি না। সেজন্য ভগবানের ওপর ফলের ভার ছেড়ে দিতে হবে। তিনি যখন যে অবস্থায় যা দেবেন, তা মাথা পেতে নিতে হবে এবং উপাসনায় একাগ্র হওয়া চাই।
- প্রত্যেক দিনের সৎ চিন্তা, সৎ কর্ম, সদ্ব্যবহার তোমাদের আদর্শ ব্যক্তিতে পরিণত করবে।
- সন্তরা ভগবানের কৃপামূর্তি। জীবের দুঃখ যন্ত্রণা দেখে কৃপাময় সন্ত-মহন্তরা স্থির থাকতে পারেন না। তাই না, বুদ্ধ, শঙ্কর, রামানুজ, শ্রীচৈতন্য প্রভৃতি মহাত্মারা জাগতিক সকল সুখ ত্যাগ করে জীবের দুঃখমোচনের জন্য জীবের দ্বারে দ্বারে ঘুরেছেন। যে কালে যে ভাবে বললে জীবের কল্যাণ হবে সেইভাবে বলেছেন। সত্যযুগে ধ্যানের দ্বারা যা লাভ হত। আবার দ্বাপর যুগে যাগযজ্ঞের দ্বারা লোকে সে ফল লাভের অধিকারী হত। এখন কলিকাল, কলির মানুষ অল্পায়ু। অল্প মেধাবিশিষ্ট। ধৈর্য্য-স্থৈর্যহীন, চঞ্চল, সাধনে দৃঢ়তা নাই; কালের ধর্মে কদাচিৎ কেউ পারে, তাই এখন-হরের্নামৈব কেবলম্।
- ভগবানই সার, আর সব অসার। শাস্ত্র, আচার্য এবং এমন কি সন্ত-মহন্তরা এক ঈশ্বর ছাড়া, জগতের সব অসার বলেছেন, ভগবানই সারাৎসার বলেছেন, সব ছেড়ে তাঁকেই একান্তভাবে আশ্রয় করতে তাই সর্বাগ্রে চাই আত্মসমীক্ষা, আত্মকৃপা।
পরমহংস মহর্ষি নগেন্দ্রনাথ ভাদুড়ীর নির্বাচিত উক্তি ও বাণী সংক্রান্ত আমাদের আজকের এই পোস্টটি ভালো লেগে থাকলে আশা করি ধর্মীয় বাণী বা ধর্ম নিয়ে উক্তি সম্পর্কিত আমাদের এই পোস্টটি ও আপনার মনের মতন হবে।
মহর্ষি নগেন্দ্রনাথের সহজ উপদেশ, Simple Teachings of Maharshi Nagendranath
- সময়ের কাছে ঘড়ি থাকবে। ঘড়ি টং টং করে বাজবে আর বলে “Gone, Gone” আর আসবে না।
- দুঃখ পড়লে বিচার করতে বসো না— কেন দুঃখে পড়লাম? বরং বিপদহারী ভগবানকে ডাকবে।
- জীবনে চাতক পাখির মত হও। সে উর্ধ্বাকাশে থাকে, সেখান থেকেই অমৃতজল পান করে।
- চাতক কখনো গ্রহণ করবে না। চাতকদ্বারিকাকে অন্তরের সঞ্জিত গুণ করবে।
- ঔষধি দ্বারা অহংকারী ব্যক্তি অভিশপ্ত হৃদয়ের অহংকার রূপ মালিন্য দূর করবে।
- মানুষের ক্ষমতা সীমাবদ্ধ। সাংসারিক ও নৈসর্গিক সকল প্রকার দুঃখ দূর করা মানুষের সাধ্য নয়। যার শক্তির সীমা নেই, সেই পরমাত্মা শ্রীহরির আশ্রয় গ্রহণ করাই শ্রেয়।
- যোগাভ্যাস নির্দিষ্ট বিধি বা নিয়ম অনুযায়ী করা চাই।
- যৌবনকাল থেকে জ্ঞানবুদ্ধির উৎপত্তি শিরোধার্য করে ঈশ্বরে ভক্তিমান, নির্লোভী, চরিত্রবান ও ধর্মপরায়ণ হতে যত্নশীল হবে।
- প্রার্থনা বা সাধনায় দৃঢ়তা থাকলে উদ্যমী হওয়া যাবে না।
- তীর্থধারণসহ শরণাগতিভাবের সর্বদা অনুশীলন করবে।
- ভক্তিপথই ভগবানকে পাবার শ্রেষ্ঠ পথ।
- বিবাহ করেছ, ভাল করেছ। সংসারাসক্তি যখন আছে, বিবাহ না করলে ধারাপাত হতে পারত। কিন্তু সংসারী হওয়া নয়, সংসারী সাজিও না।
- উদ্ধারের নিমিত্তে হরি সমুখে—পশ্চাতে হরি। সর্বত্র হরিই হরি বল হরি।
- শ্রী সত্য সাই বাবার অনুপ্রেরণামূলক উক্তি ও বাণী, Bhagavan Sri Sathya Sai Baba’s inspirational quotes and sayings in Bengali
- রামদেবের অমূল্য বাণী ও অনুপ্রেরণামূলক উক্তি, Inspirational quotes of Baba Ramdev in Bengali
- শ্রী শ্রী পরমহংস যোগানন্দ এবং তার অনুপ্রেরণামূলক উক্তি, Sri Sri Paramahamsa Yogananda and his inspirational quotes in Bangla
- শ্রী শ্রী রবি শংকরের অনুপ্রেরণামূলক বাণী এবং উক্তি, Shri Shri Ravishankar motivational quotes and teachings in Bangla
- গুরু রবিদাস এর জন্ম জয়ন্তী শুভেচ্ছা বার্তা, গুরু রবিদাসের বাণী, Guru Ravidas Jayanti wishes in Bangla
পরিশেষে
সমগ্র জীবনপথের দিকে তাকালে এটাই স্পষ্ট হয়—নগেন্দ্রনাথ ভাদুড়ী কোনো নির্দিষ্ট গণ্ডির মধ্যে আবদ্ধ সাধক ছিলেন না। চিন্তা, সাধনা ও কর্ম—এই তিনের সম্মিলনে তিনি নির্মাণ করেছিলেন এক স্বতন্ত্র আধ্যাত্মিক অবস্থান। লোকাচার ও প্রথার বাইরে দাঁড়িয়ে তিনি খুঁজেছেন জীবনের গভীর অর্থ, যেখানে আত্মশুদ্ধি ও মানবিক দায়িত্ব পরস্পরের বিরোধী নয়, বরং পরিপূরক। তাঁর জীবন আমাদের মনে করিয়ে দেয়, প্রকৃত সাধনা কেবল নির্জনতার বিষয় নয়—তা সমাজের মাঝেই নিজেকে জাগ্রত রাখার এক নীরব কিন্তু দৃঢ় প্রয়াস। এই কারণেই নগেন্দ্রনাথ ভাদুড়ী আজও স্মরণীয়, চিন্তনীয় ও অনুপ্রেরণার উৎস।

