প্ৰখ্যাত কণ্ঠশিল্পী মান্না দে -র জীবনী, Best Biography of Manna Dey in Bengali



আধুনিক বাংলা গানের গায়ক হিসেবে জগতের সর্বস্তরের শ্রোতাদের নিকট ব্যাপকভাবে জনপ্রিয় ও সফল সংগীত ব্যক্তিত্ব ছিলেন মান্না দে। তিনি নিজের সঙ্গীত জীবনে প্রায় ২৪ টি ভাষায় বহু গান রেকর্ড করেছিলেন। তিনি ষাট বছরেরও বেশি সময় ধরে সঙ্গীত নিয়ে চর্চা করেছিলেন। আজকের প্রতিবেদনের মাধ্যমে আমরা এই বিশিষ্ট শিল্পীর জীবনের বিভিন্ন তথ্য তুলে ধরার চেষ্টা করবো। 

প্ৰখ্যাত কণ্ঠশিল্পী মান্না দে -র জীবনী

মান্না দে -র জন্ম এবং পরিবার, Manna Dey’s Birth and Family

কলকাতায় ১৯১৯ সালের ১ লা মে জন্মগ্রহণ করেছিলেন এই প্রবাদপতিম শিল্পী মান্না দে। প্রবোধচন্দ্র দে ছিল তাঁর আসল নাম। বাড়িতে তাকে সবাই আদর করে মান্না নামে ডাকতেন। পরবর্তীতে এই নামেই খ‍্যাতি  লাভ করেন তিনি। মান্না দের পিতার নাম ছিল পূর্ণচন্দ্র দে এবং মাতা মহামায়া দে। গায়কের মা বাবা দুজনেই সঙ্গীত অনুরাগী‌ ছিলেন। অন্যদিকে কাকা কৃষ্ণচন্দ্র দে ছিলেন ১৯২০ এবং ৩০-এর দশকের একজন বিখ‍্যাত  গায়ক তথা সঙ্গীত পরিচালক। 

কথা সাহিত্যিক বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায়, Best Biography of Bibhutibhushan Bandyopadhyay in Bengali

শৈশব জীবনের বিবরণ, Childhood days

যে বয়সকালে ছেলেরা মাঠে ফুটবল খেলত, মান্না দে সেই বয়সেই গান নিয়ে চর্চা শুরু করেছিলেন। অর্থাৎ অনেক কম বয়স থেকেই তাঁর গানের প্রতি প্রবল অনুরাগ ছিল। তবে তিনি ছোটো বয়স থেকেই বেশ ডাকাবুকো ছিলেন, এমনকি মাঝে মাঝে মারপিট করতেন। তিনি গোবর গুহের থেকে কুস্তি ও বক্সিংও শিখেছিলেন।  মান্না দের বাবার ইচ্ছে ছিল ছেলে ওকালতি করুক‌; কিন্তু গানের পরিবেশে বড় হওয়া ছেলেটি কী করে ওকালতি করবে!

শৈশব জীবনের বিবরণ

হেমন্ত মুখোপাধ্যায়ের জীবনী, Best Biography of Hemant Mukherjee in Bengali

শিক্ষাজীবন সম্পর্কিত তথ্য, Education

শিক্ষাজীবনের শুরুতে মান্না দে ‘ইন্দুবাবুর পাঠাশালা’ তে পড়াশোনা করেছিলেন। পরে স্কটিশ চার্চ কলেজিয়েট স্কুলে ভর্তি হন, সেখানে বিদ্যার্জন শেষে পড়াশোনা করেন স্কটিশ চার্চ কলেজে। উক্ত কলেজে পাঠকালে তিনি বন্ধুমহলের আড্ডার আসরে গান শুনিয়ে আসরটিকে মাতিয়ে রাখতেন‌। একসময় তাঁর বন্ধুরা মিলে ইন্টারকলেজ মিউজিক কমপিটিশিনে তাঁর নাম দিয়ে দেয়, তখনও তিনি গানে তেমন কোনো তালিম নেন নি, তা সত্বেও গান গেয়ে মান্না দে প্রথম পুরস্কার অর্জন করেন। পুরস্কার হিসেবে পেয়েছিলেন একটি রুপোর তানপুরা।

যীশু খ্রীষ্ট জীবনী, Best biography of Jesus Christ in Bengali

Manna De in the musical world

খ্যাতনামা কণ্ঠশিল্পী মান্না দের সঙ্গীত জীবনের প্রথম অনুপ্রেরণা ছিলেন তাঁর বাবা ও মা। পাশাপাশি তাঁর কাকা কৃষ্ণচন্দ্র দের সঙ্গীত জীবনও তাঁকে অনেকটা প্রভাবিত করেছিল। সঙ্গীত শিক্ষার শুরুর দিকে তিনি কাকার কাছেই তালিম নিয়েছেন, পরবর্তীতে রেওয়াজ শুরু হয় ওস্তাদ দাবীর খানের কাছে।

সঙ্গীত জীবনে প্রবেশ

এছাড়াও উস্তাদ আমান আলি খান তথা উস্তাদ আব্দুল রহমান খানের থেকেও হিন্দুস্থানি শাস্ত্রীয় সঙ্গীতের তালিম নিয়েছিলেন তিনি। ১৯৪২ সালে, মাত্র ২৩ বছর বয়সকালে কাকার হাত ধরে মান্না ডে মুম্বাই এ চলে আসেন। প্রথম ডেবিউ করেন কাকার সঙ্গীত পরিচালনায় সৃষ্ট ছায়াছবি তামান্না- তে।

এরপর থেকে একের পর এক গানের মধ্য দিয়ে সঙ্গীত জগতে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করতে সক্ষম হন তিনি। মান্না দে নিজের সঙ্গীত জীবনে প্রায় চার হাজারেরও বেশি গান রেকর্ড করেছিলেন। বাংলা এবং হিন্দি ভাষা ছাড়াও পঞ্জাবি, মৈথিলি, গুজরাতি, কন্নড়, মারাঠি, মালায়ালম প্রমুখ ভাষাতেও গান করেছেন তিনি।

অন্যদিকে, ছোটোবেলা থেকেই রবীন্দ্র সঙ্গীতের প্রতি মান্না দের বিশেষ টান ছিল। তাঁর কণ্ঠে প্রায় ৫০ টি রবীন্দ্রসঙ্গীত রেকর্ড করা হয়েছিল। ১৯৬১ সালে ‘বহে নিরন্তর’ দিয়ে মান্না দের রবীন্দ্র সঙ্গীত রেকর্ডের যাত্রা শুরু হয়েছিল।

গুরু নানক এর জীবনী, Best biography about Guru Nanak in Bengali 

সঙ্গীত জগতে জনপ্রিয়তা অর্জন, Popularity in the music world

মান্না দে একজন একক গায়ক হিসাবে ‘ রাম রাজ‍্য’ ছবির একটি গানের মাধ্যমে প্রথম খ‍্যাতি লাভ করেন। উক্ত ছবিতে তিনি ‘ গায়ি তু তো গায়ি সীতা সতী ‘ গানটি গেয়েছিলেন যা বেশ জনপ্রিয়তা অর্জন করেছিল। ১৯৪৩ সালে ছবিটি মুক্তি পায়। এই ছবি স্বয়ং গান্ধিজী দেখেছিলেন। অতঃপর মান্না দে শচীন দেব বর্মনের সাথে ১৯৫০ সালে ‘ মশাল ‘ ছবিতে কাজ করেন‌, যেখানে তিনি দুটি গান গেয়েছিলেন, ‘ উপর গগন বিশাল ‘ এবং ‘ দুনিয়াকে লোগো ‘।

উক্ত ছবির পর থেকেই শচীন দেব বর্মনের ও মান্না দের জুটি বেঁধে কাজ শুরু হয়। এই বিশেষ জুটি বহু মনোগ্রাহী গানের ডালি সাজিয়ে তুলেছিল সঙ্গীত প্রেমী শ্রোতাদের উদ্দেশ্যে। ১৯৫৩ সালে মান্না দে “দো বিঘা জমি” ছবিতে সলিল চৌধুরীর কম্পোজিশনে কন্ঠ দিয়েছিলেন। উক্ত ছবির গানগুলো তাঁকে জনপ্রিয়তার এক ধাপ উপরে নিয়ে যায়।

সঙ্গীত জগতে জনপ্রিয়তা অর্জন

একই সালে প্রকাশ পায় তাঁর গাওয়া কিছু বাংলা আধুনিক গান; “কত দূরে আর নিয়ে যাবে বলো”, “হায় হায় গো, রাত যায় গো” ইত্যাদি। এই গানগুলো দর্শকমহলকে স্তম্ভিত করে তুলেছিল। এরপর ১৯৫৬ সালে গৌরীপ্রসন্ন মজুমদারের লেখা গানে নিজের সুর দিয়ে মান্না দে “তুমি আর ডেকো না পিছু ডেকো না” এবং “তীর ভাঙা ঢেউ আর নীড় ভাঙা ঝড়” গান শ্রোতাদের সম্মুখে প্রকাশ করেন। এর দু’বছর পর ১৯৫৮ সালে প্রকাশ পায়, ‘চাঁদের আশায় নিভায়ে ছিলাম’, ‘এ জীবনে যত ব্যথা পেয়েছি’, ‘এই কুলে আমি, আর ওই কুলে তুমি, মাঝখানে নদী ঐ বয়ে চলে যায়’ প্রমুখ গানগুলো।

এভাবে একের পর এক গানের মধ্য দিয়ে তিনি বাংলা সঙ্গীতের জগতে নিজের জায়গা পাকা করে নিয়েছিলেন। নিজেকে একজন সঙ্গীতকার তথা সুরকার হিসাবে প্রতিষ্ঠিত করতে সক্ষম হন তিনি। ১৯৬৬ সালে উত্তম কুমার অভিনীত ‘শঙ্খবেলা’ ছবিতে সুধীন দাশগুপ্ত মান্না দে কে দিয়ে গান করানোর কথা ভাবেন, ভাবনা অনুযায়ী কাজ করতে গিয়ে গায়কের কণ্ঠে রচিত হয় এক সুমধুর গান, ‘কে প্রথম কাছে এসেছি’। সেই থেকেই উত্তম-মান্না-সুধীন জুটি চলতে থাকে।

অতঃপর মান্না দে জুটি বাঁধেন লতা ও আশার সঙ্গে; লতার সাথে জুটি বেঁধে গাওয়া তাঁর প্রথম গান হল ‘লপট কে পোট পাহানে বিক্রল’; অন্যদিকে আশার সাথে গাওয়া প্রথম গান ছিল, ‘রাত গয়ি ফির দিন আয়া’ গানটি।

ফ্র্যাংকলিন রুজভেল্টের জীবনী, Best Biography of Franklin Roosevelt in Bengali

ব‍্যক্তিগত জীবন সম্পর্কে কিছু তথ্য, Personal life

বিখ্যাত সঙ্গীতশিল্পী মান্না দে ১৯৫৩ সালে বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হন। তিনি কেরলের মেয়ে সুলোচনা কুমারণকে বিয়ে করেছিলেন। স্ত্রী সুলোচোনা ছিলেন ইংরেজী সাহিত‍্যের ছাত্রী এবং পেশাগত ভাবে অধ‍্যাপনার সাথে যুক্ত ছিলেন। তিনিও বেশ ভালো গান গাইতেন। দুর্ভাগ্যবশত ২০১২ সালে সুলোচনা ক‍্যানসার রোগে আক্রান্ত হয়ে মারা যান।

ব‍্যক্তিগত জীবন সম্পর্কে কিছু তথ্য

এই দম্পতির দুই কন‍্যা সন্তান রয়েছে, যাদের নাম সুরোমা এবং সুমিতা‌। জীবনসঙ্গিনী হারিয়ে গায়কের আর বাঁচার কোনো ইচ্ছেই ছিল না। স্ত্রীকে তিনি এতটাই ভালোবাসতেন যে নিজের অসুস্থতার মধ্যেও সুলোচনার উদ্দেশ্যে একটি অ্যালবম বের করতে চেয়েছিলেন মান্না দে। উক্ত অ্যালবমের চারটি গান তিনি নিজেই লিখেছিলেন, এবং সেই গানগুলির সাথে দুটি রবীন্দ্রসঙ্গীতও রাখবেন বলে ভেবেছিলেন। কিন্তু শারীরিক দুর্বলতার কারণে সেগুলো আর রেকর্ড করা হয়নি। 

গায়কের জীবনাবসান, Death of the artist

ফুসফুসের জটিলতার কারণে ২০১৩ সালের ৮ ই জুন মান্না দে কে ব্যাঙ্গালোরের এক হাসপাতালের আইসিইউ তে ভর্তি করানো হয়। এর পরের দিনই, অর্থাৎ ৯ ই জুন তাঁর মৃত্যুর গুজব রটে যায়৷ কিন্তু সেখনকার ডাক্তাররা নিশ্চিত করেন যে তিনি জীবিত আছেন এবং গুজবের অবসান ঘটান। তবে সময়ের সাথে সাথে মান্না দের অবস্থার অবনতি হতে থাকে এবং শারীরিক সমস্যার ক্ষেত্রে আরও নতুন ধরনের জটিলতা দেখা দিতে শুরু করে।

গায়কের জীবনাবসান

তিনি যখন অসুস্থ অবস্থায় হাসপাতালে ছিলেন তখন তাঁর কেবিনে স্ত্রীর একটি ছবি রেখেছিলেন। দীর্ঘ সময় ধরে অসুস্থতার সাথে যুদ্ধ করার পর ২০১৩ সালের সালের ২৪শে অক্টোবর তিনি ইহলোক ত্যাগ করেন। তবুও তিনি রয়েছেন বহু মানুষের মননে, বরণে, হৃদয়ে; তাঁর সঙ্গীতের মধ্য দিয়ে তিনি সর্বদাই আমাদের মধ্যে জীবিত আছেন।

মান্না দে-র আত্মজীবনী ও খ্যাতি, Autobiography and reputation of Manna Dey

মান্না দে-র আত্মজীবনীর নাম ‘জীবনের জলসাঘরে’, যা ২০০৫ সালে প্রকাশিত হয়েছিল। তাছাড়াও তাঁকে নিয়ে একটি তথ্যচিত্রও তৈরি হয়েছিল, যা প্রকাশ পায় ২০০৮ সালে। উক্ত তথ‍্যচিত্রটির শ‍্যুটিং করা হয়েছিল কফি হাউসে।

মান্না দে-র আত্মজীবনী ও খ্যাতি

 বিজ্ঞানী স্টিফেন হকিং- এর জীবনী, Best Biography of scientist Stephen Hawking in Bengali

বিখ্যাত সঙ্গীতশিল্পীর কালজয়ী কিছু গান, Some most popular songs of Manna Dey 

মান্না দের হিন্দি ভাষায় গাওয়া কালজয়ী কিছু গান এখনও মানুষের মুখে মুখে‌ শোনা যায়, যেমন :

● ‘পেয়ার হুয়া ইকরার হুয়া’, 

●  ‘এয় মেরি জোহরা জবি’, 

●  ‘এক চতুরনার’ 

এছাড়া তাঁর গাওয়া বিখ‍্যাত বাংলা গানগুলোর জনপ্রিয়তাও বর্তমানে অটুট রয়েছে। যেমন :

● ‘ কফি হাউসের সেই আড্ডাটা আজ আর নেই’, 

● ‘ আমি যে জলসাঘরে ‘, 

● ‘ আমি শ্রী শ্রী ভজহরি মান্না’,

● ‘আমি যামিনী তুমি শশী হে’

বিখ্যাত সঙ্গীতশিল্পীর কালজয়ী কিছু গান

পুরস্কার ও সম্মাননা, Awards and recognitions 

সঙ্গীতের ভুবনে মান্না দের অসামান্য অবদানের স্বীকারস্বরূপ ভারত সরকার তাঁকে বহু পুরস্কারে ভূষিত করেন। ১৯৭১ খ্রিস্টাব্দে তিনি পদ্মশ্রী পুরস্কার অর্জন করেন, ২০০৫ সালে পদ্মবিভূষণ এবং ২০০৭ সালে দাদাসাহেব ফালকে সম্মাননা অর্জন করেন। পশ্চিমবঙ্গ সরকার ২০১১ সালে রাজ্যের সর্বোচ্চ অসামরিক সম্মান বঙ্গবিভূষণ মান্না দে কে প্রদান করেছিল।

উপসংহার, Conclusion 

সুখ্যাত সঙ্গীতশিল্পী মান্না দে ভারতীয় উপমহাদেশের অন্যতম সেরা সঙ্গীত শিল্পী এবং সুরকারদের মধ্যে একজন ছিলেন। অনেক বিশেষজ্ঞ সংগীত বোদ্ধারা বৈচিত্র্যের বিচারে তাঁকেই ভারতীয় সঙ্গীত ভুবনে সবর্কালের অন্যতম সেরা গায়ক রূপে স্বীকার করে থাকেন। তিনি নিজের অপূর্ব সুন্দর কন্ঠ তথা গানগুলোর মাধ্যমে সকলের মন জয় করতে সক্ষম হয়েছিলেন। ভারতে হয়তো এমন কোনো স্থান নেই যেখানের মানুষ তাঁর গান শোনেন নি।

Frequently asked questions:

মান্না দে কে?

আধুনিক বাংলা গানের গায়ক হিসেবে জগতের সর্বস্তরের শ্রোতাদের নিকট ব্যাপকভাবে জনপ্রিয় ও সফল সংগীত ব্যক্তিত্ব ছিলেন মান্না দে।

মান্না দে কবে জন্মগ্রহণ করেন ?

১৯১৯ সালের ১ লা মে জন্মগ্রহণ করেছিলেন।

মান্না দের স্ত্রীর নাম কি?

কেরলের মেয়ে সুলোচনা কুমারণ।

মান্না দে কবে মৃত্যুবরণ করেন ?

২০১৩ সালের ৮ ই জুন

Recent Posts