ব্রিটিশ লেখিকা এবং ঔপন্যাসিক তাহমিমা আনাম, Biography of Bangladeshi writer Tahmima Anam in Bengali



তাহমিমা আনাম বাংলাদেশ বংশোদ্ভূত একজন ব্রিটিশ লেখিকা এবং ঔপন্যাসিক। তিনি ব্রিটিশ লেখিকা হিসেবে নিজের কাজের মাধ্যমে বিদেশে তথা দেশেও জনপ্রিয়তা অর্জন করেছিলেন।

ব্রিটিশ লেখিকা এবং ঔপন্যাসিক তাহমিমা আনাম

জন্ম ও শৈশব বৃত্তান্ত, Birth and childhood Memories 

তাহমিমা আনম জন্মগ্রহণ করেন ১৯৭৫ সালের ৮ অক্টোবর। বাংলাদেশের ঢাকায় তাঁর জন্ম হয়। তাঁর বাবা মাহফুজ আনাম পেশায় বাংলাদেশের “দ্য ডেইলি স্টার” নামক দৈনিক পত্রিকার সম্পাদক এবং মা শাহীন আনাম বাংলাদেশের মানবাধিকার সংস্থা “মানুষের জন্য”-এর প্রধান। তাহমিমা বিখ্যাত সাহিত্যিক ও রাজনৈতিক আবুল মনসুর আহমেদের নাতনি। মাত্র ২ বছর বয়সে, তাহমিমা প্যারিসে চলে যান, কারণ তাঁর বাবা-মা দুজনেই জাতিসংঘে ইউনেস্কোতে কর্মচারী হিসাবে যোগদান করেছিলেন, সেই সুবাদে তাহমিমার শৈশব ও কৈশোরকালের অধিকাংশ সময়ই কেটেছে বাংলাদেশের বাইরে। 

জন্ম ও শৈশব বৃত্তান্ত

নবজাগরণের পথিকৃৎ রাজা রামমোহন রায়ের জীবনী, Biography of Raja Rammohan Roy in Bengali

শিক্ষা অর্জন, Education 

তাহমিমা আনাম পড়াশোনা করেছেন ইংরেজি মাধ্যমে; তবে ইংরেজি মাধ্যমে পড়াশোনা করা সত্বেও বাংলা সংস্কৃতির চর্চা করেছেন। তাঁর বাবা-মা ছোটবেলা থেকেই বাড়িতে তাহমিমার সাথে বাংলাতে কথা বলতেন আর সময় সময় দেশ- বাড়িতে নিয়ে আসতেন। চাকুরিতে ইস্তফা দিয়ে একসময় তাঁর বাবা-মা চিরস্থায়ীভাবে দেশে ফিরে এলেও পড়াশোনার জন্য তাহমিমা বিদেশেই থেকে গিয়েছিল; তবে মাঝেমধ্যেই তিনি বাংলাদেশে এসে ঘুরে আসতেন। ১৯৯৭ সালে, ১৭ বছর বয়সে, তিনি মাউন্ট হলিওক কলেজ থেকে স্নাতক ডিগ্রি লাভ করেছিলেন।

তাহমিমা যুক্তরাষ্ট্রের স্বনামধন্য হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ‘সমাজ নৃতত্ত্ব’ বিষয়ে পিএইচডি ডিগ্রী অর্জন করেন। পিএইচডি শেষ করার পর কাব্যজগতের অনন্য প্রতিভা অ্যান্ড্রু মোশনের অধীনে লন্ডনের রয়েল হলওয়ে কলেজে “Creative Writing” এর স্নাতকোত্তর কোর্সে ভর্তি হন তিনি। তাঁর পূর্বে পঠিত বিষয়ের চেয়ে এই কোর্সটি ছিলো সম্পূর্ণই ভিন্ন; তবে তাহমিমার মতে সমাজবিজ্ঞান এবং সাহিত্য পরস্পর সম্পর্কযুক্ত; এ সম্বন্ধে তিনি বলেছেন, 

শিক্ষা অর্জন

“সামাজিক সম্পর্ক ও আদান প্রদান, পর্যবেক্ষণ ও বিশ্লেষণ করেন সমাজবিজ্ঞানী। ভালো লেখক হওয়ার মূল চাবিও কিন্তু পর্যবেক্ষণ। তাই আমার মনে হয়না যে আমি উল্টো পথে হেঁটেছি। তাছাড়া বরাবরই তো আমি লেখক হতে চেয়েছি। আমার শুধু মনে হয়েছে লেখালেখি শুরুর আগে একটি প্রফেশনাল ডিগ্রী নেয়া বড় জরুরি। পিএইচডি করার পুরো সময়টিও কিন্তু আমি উপন্যাসটি নিয়ে ভেবেছি; সেটি লেখার প্রস্তুতি নিয়েছি।”

বিশ্ববন্দিত কবি মাইকেল মধুসূদন দত্ত’র জীবনী, Biography of Michael Madhusudan Dutta in Bengali   

প্রথম উপন্যাস, First novel

তাঁর প্রথম উপন্যাস ‘A Golden Age’ বা স্বর্ণযুগ রচনার কাজ তিনি ২০০৪ সালে শুরু করেছিলেন। বাংলাদেশে না থাকার কারণে বাংলার উপর তাঁর ভালো দখল ছিলোনা , এজন্যই মূলত ইংরেজি ভাষায় লেখা শুরু করেছিলেন তিনি। ইংরেজি ভাষা ব্যবহার করে নিজের লেখার মাধ্যমে বিশ্ববাসীর কাছে বাংলার ইতিহাস ও ঐতিহ্যকে ফুটিয়ে তোলার সুযোগ তাঁকে অনুপ্রাণিত করেছিল। কোর্সের পাশাপাশি লেখার কাজ চালিয়ে যাবার কারণে একসময় তাঁর লেখার একটি অংশ বেডফোর্ড স্কয়ার নামক একটি সংকলনে ছাপা হয়। উক্ত সংকলনটি ছিলো কোর্সটিতে অংশগ্রহণকারী শিক্ষার্থীদের রচনার সংকলন। অ্যান্ড্রু মোশনের সংকলনটির প্রকাশক ছিলেন জন মারে। তাহমিমার লেখা অংশটুকু পড়ে খুব ভালো লাগে ম্যারের, তাই তিনি তাহমিমার সাথে বইটি প্রকাশের কথা বলে একটি চুক্তি করেন। এই চুক্তি অনুসারে ম্যারের কোম্পানি তাহমিমার বই প্রকাশ করবে বলে ঠিক হয়। তাঁর দ্বিতীয় বইয়ের বিষয়বস্তু ছিল ‘১৯২০-এর কলকাতা’ নিয়ে। 

প্রথম উপন্যাস

‘A Golden Age’ – এর বিষয়বস্তু, subject-matter of ‘A Golden Age’

তাহমিমার প্রথম উপন্যাস ‘A Golden Age’ – এর বিষয়বস্তু হল বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধ। তাঁর জন্মের ৪ বছর আগেই মুক্তিযুদ্ধ শেষ হয়ে গিয়েছিল, তবুও তিনি নিজের পূর্ব-পুরুষদের প্রেরণাকে পুঁজি করে মুক্তিযুদ্ধের চেতনাকে তাঁর উপন্যাসের মাধ্যমে তুলে ধরতে সমর্থ হয়েছেন। মূলত বাংলাদেশের মানুষের দৃষ্টিতে তিনি মুক্তিযুদ্ধের চেতনা ফুটিয়ে তুলেছেন তাঁর লেখায়। এর জন্য তিনি গ্রামে গ্রামে ঘুরে অনেক মুক্তিযোদ্ধাদের সাক্ষাৎকার নিয়েছিলেন, তাদের সাথে কথাবার্তার মাধ্যমে উক্ত বিষয় সম্পর্কে বিশদ তথ্য আহরণ করেছিলেন। এছাড়াও তারেক মাসুদ ও ক্যাথরিন মাসুদ পরিচালিত “মাটির ময়না” চলচ্চিত্রের নির্মাণ সেটেও কাজ করেছেন তিনি, এসময় মুক্তিযুদ্ধ সম্বন্ধে তাহমিমা নিগূঢ় জ্ঞান লাভ করেন।

তাঁর উপন্যাসটির কেন্দ্রীয় চরিত্রের নাম ‘রেহানা’। চরিত্রটি তাহমিমা নিজের দাদীমার সাথে মিল রেখে রচনা করেছিলেন । এই ঐতিহাসিক কল্পকাহিনীমূলক উপন্যাসটি রেহানা হকের দৃষ্টিভঙ্গি থেকে রচিত। কাহিনীতে রেহানা হক একজন বিধবা মা যিনি বাংলাদেশ মুক্তিযুদ্ধে নানা প্রতিকূলতার মধ্য দিয়ে দিনযাপন করছেন, কারণ তাঁর দুই সন্তানই যুদ্ধের সাথে ক্রমশ জড়িত হয়ে পড়েছিল।

মুক্তিযুদ্ধের চেতনা

উপন্যাসের শুরুতেই রেহানার স্বামীর মৃত্যু এবং এরপরের অংশ সন্তানদের হেফাজত ফিরে পাওয়া মামলায় হেরে যাওয়া নিয়ে; তারপর উপন্যাস দ্রুত এগিয়ে যায় যুদ্ধ পরিস্থিতির দিকে, যেখানে রেহানা আবার তাঁর সন্তানদের নিজের কাছে ধরে রাখার জন্য লড়াই করে। রেহানা সন্তানদের মনের গভীরে থাকা আবেগপূর্ণ জাতীয়তাবাদ বুঝতে পারেন না। উপন্যাসটির অভ্যন্তরীণ কাহিনীর বর্ণনা ১৯৭১ সালের ১৬ ডিসেম্বরে গিয়ে শেষ হয়, অর্থাৎ যে বছর বাংলাদেশ স্বাধীনতা লাভ করে।

বিশিষ্ট ধর্ম সংস্কারক কেশবচন্দ্র সেনের জীবনী, Biography of Keshab Chandra Sen in Bengali

সাহিত্যচর্চা, Literature 

২০০৭ সালের মার্চে তাঁর প্রথম উপন্যাস ‘A Golden Age’, ইংল্যান্ড থেকে প্রকাশিত হয়। পরবর্তী সময়ে উপন্যাসটি “সোনাঝরা দিন” নামে বাংলা ভাষায়ও অনূদিত হয়েছে। তাঁর লেখা দ্বিতীয় উপন্যাস ‘The Good Muslim’, ২০১১ সালের মে মাসে প্রকাশিত হয় এবং একই সালে ‘ম্যান এশিয়ান লিটারেরি প্রাইজ ২০১১’-এর জন্য প্রাথমিকভাবে মনোনীত হয়।

২০১৫ সালে, রানা প্লাজা ভবন ধসের ঘটনার দ্বারা অনুপ্রাণিত হয়ে লেখা তাঁর ছোট গল্প “গার্মেন্টস” প্রকাশিত হয়। এই গল্প ‘ও. হেনরি’ পুরস্কারে ভূষিত হয় এবং বিবিসি জাতীয় ছোটগল্প পুরস্কারের জন্যও তালিকাভুক্ত করা হয়েছিল।  একই বছর, তিনি ‘ম্যান বুকার আন্তর্জাতিক পুরস্কার ২০১৬’-এর অনুষ্ঠানে বিচারক হিসেবে যোগ দিয়েছিলেন ।

সাহিত্যচর্চা

২০১৬ সালে, তাহমিমার উপন্যাস “দ্য বোনস অফ গ্রেস” হার্পারকলিন্স নামক প্রকাশক সংস্থার মাধ্যমে প্রকাশিত হয়। পরের বছর, তিনি রয়্যাল সোসাইটি অফ লিটারেচারের একজন ফেলো হিসেবে নির্বাচিত হন।  আনামের কিছু লেখা দ্য নিউ ইয়র্ক টাইমস, দ্য গার্ডিয়ান এবং নিউ স্টেটসম্যানে প্রকাশ করা হয়েছে, যেখানে তিনি বাংলাদেশ এবং এর ক্রমবর্ধমান সমস্যাগুলো নিয়ে লিখেছেন। ২০২১ সালে, তাঁর উপন্যাস ‘The Startup Wife’ প্রকাশিত হয় Canongate Books- এর মাধ্যমে। উক্ত উপন্যাসটি অবজারভার (Observer), স্টাইলিস্ট (Stylist), কসমোপলিটান (Cosmopolitan), রেড (Red) এবং ডেইলি মেইল (Daily Mail) দ্বারা ২০২১ সালের সেরা বই হিসাবে নির্বাচিত হয়েছিল।

২০২২ সালে, তাহমিমা টেড সংস্থার সম্মেলনে “The Power of Holding Silence: Making the Workplace Work for Women” শিরোনামে একটি বক্তৃতা দেন।  একই বছর, তাঁর লেখা ‘A Golden Age’ উপন্যাসটি ‘Queen’s jubilee book’ – এর তালিকাভুক্ত হয়।

সাহিত্যিক সৈয়দ মুজতবা আলীর জীবনী, Biography of Syed Mujtaba Ali in Bengali

তাহমিমা আনামের লেখা বই, Books written by Tahmima Anam

● The Bones of Grace. HarperCollins. 2016.

● The Startup Wife. Canongate Books. 2021. 

তাহমিমা আনামের লেখা বই

ছোটো গল্প, Short Stories 

● “Saving the World”. Granta. No. Autumn. London. 2008.

● “Anwar Gets Everything”. Granta. No. Spring. London. 2013.

● “Garments”. Freeman’s. No. Fall 2015. London. 2015.

পুরস্কার, Rewards 

● বাংলাদেশ ডিসার্টেশন অ্যান্ড প্রিডিসার্টেশন অ্যাওয়ার্ড, ২০০০ – ০১। (Bangladesh Dissertation and Predissertation Award)

● কমনওয়েলথ সেরা প্রথম বই পুরস্কার ২০০৮, ২০০৮ (Commonwealth Overall Best First Book for A Golden Age)

পুরস্কার

বৈবাহিক জীবন, Married Life 

তাহমিমা আনাম ২০১০ সালে রোল্যান্ড ও ল্যাম্ব নামক একজন আমেরিকান উদ্ভাবককে বিয়ে করেছিলেন, তাদের পরিচয় হয়েছিল হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয়ে।  এই দম্পতির এক পুত্র সন্তান রয়েছে, যার নাম রাখা হয়েছিল রুমি। তাহমিমা গত এক দশক ধরে লন্ডনের কিলবার্নে বসবাস করছেন। 

বৈবাহিক জীবন

উপসংহার, Conclusion 

“Creative Writing” কোর্সে পড়াশোনা করা তাহমিমা আনমকে সাহিত্য জগতে প্রতিষ্ঠিত হওয়ার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছিল; কারণ এই শিক্ষাবিষয়টি তাঁর উপন্যাস লেখার কাজে দারুণ সহযোগিতা করেছিল। উক্ত বিষয়ে শিক্ষাজীবন শেষ করতে না করতেই তিনি নিজের প্রথম উপন্যাস লেখার কাজ শুরু করে দিয়েছিলেন। এছাড়া পারিবারিক ঐতিহ্যও লেখার জন্য তাঁকে উৎসাহিত করেছিল।

Frequently Asked Questions

তাহমিমা আনামের জন্ম কবে হয় ?

১৯৭৫ সালের ৮ অক্টোবর।

তাহমিমা আনামের মাতা পিতার নাম কি?

বাবা মাহফুজ আনাম 

       মা শাহীন আনাম।

তাহমিমা আনামের প্রথম উপন্যাসের নাম কি?

‘The Golden Age’

Recent Posts