চরিত্র গঠনে খেলাধুলার ভূমিকা, Value of sports in character building in Bengali



ভূমিকা, Introduction 

দেহ এবং মনের যথার্থ বিকাশ ঘটার মধ্য দিয়েই মানব চরিত্রের পূর্ণবিকাশ সম্ভব হয়। আমাদের দেহ ও মনের সঠিক বিকাশ ঘটাতে হলে মন থেকে আলস্য, ক্লান্তি এবং জড়তারকে নির্মূল করতে হবে, আর তা করতে খেলাধুলার কোন বিকল্প নেই। জ্ঞানচর্চা ও খেলাধুলা শিশু থেকে কিশোর বয়সে বেড়ে ওঠার পথে পরস্পরের পরিপূরক ভূমিকা পালন করে, তাই চারিত্রিক বৈশিষ্ট্যও সঠিক ভাবে বিকশিত হয়। মানুষের পূর্ণাঙ্গ চরিত্র গঠন পরিপূর্ণ দৈহিক এবং মানসিক বিকাশের মধ্য দিয়েই সম্ভব হয়।

চরিত্র গঠনে খেলাধুলার ভূমিকা

প্রাচীনযুগের বিভিন্ন খেলাধুলার প্রচলন, Practice of various sports in ancient times

সভ্যতার শুরু হওয়ার কিছুকাল পরই খেলাধুলার উদ্ভব হয়েছিল এবং সময়ের সাথে তা ধীরে ধীরে বিকাশ লাভ করে। অতীতকালে মানুষ আনন্দ খোঁজার উদ্দেশ্যে খেলাধুলার আবিষ্কার করেছিল। আমরা প্রাচীন বিভিন্ন কাব্য এবং পুরাণ পড়ে জানতে পারি যে প্রাচীনকালে নানা রকমের খেলাধুলার প্রচলন ছিল।

প্রাচীন যুগে খেলাগুলোর মধ্যে একটি উল্লেখযোগ্য খেলা হল মল্লযুদ্ধ, এই বিশেষ খেলা থেকে উল্লেখ পাওয়া যায় শারীরিক কসরত এর। এছাড়াও তখনকার সময়ে লাঠি খেলা এবং কুস্তি খেলারও প্রচলন ছিল। পরবর্তীতে অলিম্পিকের সূত্রপাত ছিল খেলাধুলার ইতিহাসে হওয়া সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ এবং উল্লেখযোগ্য একটি ঘটনা।

প্রাচীনযুগের বিভিন্ন খেলাধুলার প্রচলন

শিক্ষা বিস্তারে গ্রন্থাগারের ভূমিকা, Know about Contribution of library in education in Bengali

বর্তমান সময়ের উল্লেখযোগ্য খেলাধুলা, Notable sports of the present time

জন্মের পর থেকেই শিশুদের খেলাধুলা শুরু হয়ে যায় হাত-পা ছুড়াছুড়ির মধ্য দিয়ে। সেক্ষেত্রে বলা যায় যে খেলাধুলার প্রতি যেকোনো শিশুর আকর্ষণ কিছুটা সহজাত প্রক্রিয়ার অংশ। খেলাধুলার মধ্য দিয়ে মানব চরিত্র উন্মুক্ত এবং প্রসারিত হতে থাকে। সেজন্যই খেলাধুলা এবং শরীরচর্চা হল আধুনিক শিক্ষার এক অপরিহার্য অঙ্গ।

বর্তমান সময়ের উল্লেখযোগ্য খেলাধুলা

আজকাল বিভিন্ন স্কুলের পাঠক্রমে বাধ্যতামূলকভাবে যোগ হয়েছে বিভিন্ন খেলা, যেমন – ব্যাডমিন্টন, হকি, স্কেটিং, বাস্কেটবল, হাডুডু, সাঁতার, জিমনাসটিক, দৌড় প্রতিযোগিতা, টেবিল টেনিস, ফুটবল, ক্রিকেট ইত্যাদি। আরো বহু খেলা আছে যা স্কুল কলেজে বিভিন্ন সময়ে অনুষ্ঠিত হয়, যাদের দুইটি ভাগে ভাগ করে দেওয়া হয়, একটি হল Indoor Game এবং অপরটি Outdoor Game। ইনডোর গেমস হল সেগুলো যা ঘরের মধ্যে থেকেও খেলা যায়, আর আউটডোর গেমস হল সেগুলো যা খেলতে মাঠে বা বাইরে যেতে হয়।

মাতৃভাষার মাধ্যমে শিক্ষাদান, Best essay on Education through mother tongue in Bengali

ছাত্রছাত্রীদের চরিত্র গঠনের ক্ষেত্রে খেলাধুলার প্রয়োজনীয়তা, Importance of sports in character building of students

মানব শরীরের পাশাপাশি মনকেও আনন্দ যোগানোর জন্য খেলাধুলা অত্যন্ত প্রয়োজনীয়। খেলাধূলার মাধ্যমে শুধু যে আমাদের শরীরচর্চা হয় তা না, বরং খেলাধুলার মধ্য দিয়ে আমরা নিয়ম মত চলা শিখে নিতে পারি, অর্থাৎ নিয়মানুবর্তী হতে সহায়তা করে এই খেলাধূলা। এছাড়া সময় সম্পর্কেও সচেতন হওয়া যায়।  খেলাধুলা আমাদের মধ্যে শৃঙ্খলা এবং ঐক্যবদ্ধের শিক্ষা নিয়ে আসে। খেলাধুলার মধ্য দিয়ে আমরা নিজের দলকে নেতৃত্ব দেওয়ার শিক্ষা পাই।

খেলার মধ্যে দিয়ে মন উদার হয়ে ওঠে তাই জয়-পরাজয় কেও স্বাভাবিক ব্যাপার বলে মনে হয়। এছাড়াও নিজের উপর আত্মবিশ্বাস আসে। খেলাধুলার শৃঙ্খলা আমাদের মধ্যে জন্ম দেয় চারিত্রিক দৃঢ়তা এবং মানসিক বৈশিষ্ট্যতার। খেলার মধ্য দিয়ে মানুষ একাগ্রতা, ধৈর্য্য, দক্ষতা, সাহস, সহ্যশক্তি এবং উদারতা অর্জন করে। কোনো ব্যক্তি যদি নিজের জীবনে একজন সফল খেলোয়াড় হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হয়ে ওঠে তবে দেশবাসী তথা বিশ্ববাসীর কাছে সদা স্মরণীয় হয়ে থাকেন।

ছাত্রছাত্রীদের চরিত্র গঠনের ক্ষেত্রে খেলাধুলার প্রয়োজনীয়তা

তাই খেলাধুলা সকলের জীবনের এক গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়। নিয়মিত তথা পরিমিত খেলাধূলার  মাধ্যমে মানুষ সুস্বাস্থ্যের অধিকারী হয়ে ওঠে। খেলাধুলায় জয় পরাজয় লেগেই থাকে, আর সেই থেকেই মানুষ অতি সহজে জীবনের বিভিন্ন পর্যায়ের জয়-পরাজয়গুলোকেও মেনে নিতে শিখে যায়।

শিক্ষাবিস্তারে গণমাধ্যমের ভূমিকা, Role of mass media in Education in Bengali

খেলাধূলার প্রভাব ও চারিত্রিক বৈশিষ্ট্যের বিকাশ, Effect of sports on character development

খেলাধূলায় কখনও জয়ী হওয়া আবার কখনও হেরে যাওয়া লেগেই থাকে। তবে জয়লাভ করতে হলে দলের সহ খেলোয়াড়দের পারস্পরিক সক্রিয় সহযোগিতা প্রয়োজন হয়, আর এই সত্য উপলব্ধি করতে পারলেই মনের মধ্যে জাগ্রত হয় সহমর্মিতা এবং খেলার সময়ে তা প্রয়োগ করতে হয়।

এই সহমর্মিতার প্রভাবেই খেলোয়াড়দের অন্তরে প্রবেশ করে মমত্ববোধ, ভ্রাতৃত্ব তথা উদারতার মনোভাব। তবে, কোনো দলে সহ খেলোয়াড়দের মধ্যে পারস্পরিক সহযোগিতার যদি অভাব থাকে তখন যেকোনো খেলার ক্ষেত্রেই জয়লাভ করা কঠিন হয়ে পড়ে, এই ব্যাপারটা একমাত্র খেলার মাঠেই উপলব্ধি করা সম্ভব হয়।

খেলাধূলার প্রভাব ও চারিত্রিক বৈশিষ্ট্যের বিকাশ

জীবনের প্রতি পদক্ষেপে সততার মূল্য অপরিসীম- এই কথাটিও হৃদয়ঙ্গম করানোর ক্ষেত্রে খেলাধুলা বিশেষ ভূমিকা পালন করে। যেকোনো খেলাধুলার ক্ষেত্রেই অসদাচরণ বা অসৎ বুদ্ধির কোনোও স্থান নেই। এইসব কু-মনোভাবের সহায়তায় সাময়িকভাবে খেলোয়াড়রা জয়ী হলেও অবিলম্বে তাদের স্বরূপ প্রকাশিত হবেই।

 অন্যদিকে খেলাধূলা সাহসী, উদ্যমী এবং পরমতসহিষ্ণু হয়ে ওঠার জন্যও আদর্শ একটি মাধ্যম। খেলাধুলা মানব মনে আনন্দ লাভ তথা আনন্দ প্রদান উভয় ক্ষেত্রেই কাজ করে। বলাই বাহুল্য যে, আমাদের মানসিক কাঠামোকে আরো সুন্দর করে তোলার পাশাপাশি খেলাধুলা আমাদের দৈহিক শ্রীবৃদ্ধিও সাধন করে। তাই, আমাদের দৈহিক অবক্ষয় রোধ করার জন্যও খেলাধুলা করার ব্যাপারে প্রচার এবং প্রসার ঘটানোর চেষ্টা যেকোনো জাতির কাছে প্রাথমিক তথা একটি আবশ্যিক কর্তব্য হওয়া উচিত।

ছাত্রজীবনের দায়িত্ব ও কর্তব্য, Responsibilities and duties of student life in Bengali

জাতীয়তা বোধ এবং বিশ্বমানবতা বোধের বিকাশে খেলাধূলা, Sports in the development of nationality and sense of Internationalism

বর্তমান সময়ের খেলাধূলার উদ্দেশ্য ব্যাপকতর হয়ে উঠেছে। তবে শুধু ব্যক্তিজীবনকেই নয়, বরং জাতীয় জীবনকে জাগ্রত করে তোলাও খেলাধূলার একটি লক্ষ্য হিসাবে ধরা হয়। বর্তমান সময়ে জাতীয় তথা আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রে নির্দিষ্ট কিছু সমস্যাকে দূরে রাখার জন্য খেলাধূলা হল অন্যতম একটি মাধ্যম। বর্তমান সময়ে জাতীয় এবং আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রে হিংসা, বিদ্বেষ, ঘৃণা প্রভৃতি অনেকাংশে দেখা যাচ্ছে, এইসব কিছু খেলাধূলার মাধ্যমে দূর করা সম্ভব হবে। শুধুমাত্র দেশের সমস্যাগুলো সমাধান করার ক্ষেত্রেই নয় বরং খেলাধূলা আন্তর্জাতিক শান্তি রক্ষার ক্ষেত্রেও সহায়ক।

জাতীয়তা বোধ এবং বিশ্বমানবতা বোধের বিকাশে খেলাধূলা

সাহিত্য পাঠের প্রয়োজনীয়তা, Know about the Necessity to study literature in Bengali

ভারতে খেলাধূলা, Sports in India

 আমাদের দেশে খেলাধূলার চিত্র বড়ই করুণ। অধিকাংশ স্কুল এবং কলেজগুলোতে শরীরচর্চার যথোপযুক্ত কোনোও ব্যবস্থা করা হয়নি, আর ছাত্রছাত্রীদের এর কুফলই ভোগ করতে হচ্ছে। আমাদের দেশে বসবাসকারী প্রায় অধিকাংশ সংখ্যক তরুণ-তরুণীই অস্বাস্থ্যের অধিকারী, অপুষ্টি জনিত রোগে ভুগছে তারা।

তাছাড়া শরীরচর্চা করা তো দূরের থাক, আগেকার দিনের মত খেলাধুলা করার অভ্যাস আজকাল আর দেখা যায় না। খেলাধুলা নিয়ে কারোরই তেমন মাথা ব্যথা নেই, ফলস্বরূপ আন্তর্জাতিক ক্রীড়া ক্ষেত্রগুলিতে আমাদের দেশের ব্যর্থতার চিত্র করুণ হয়ে ওঠে। বছরে বছরে অলিম্পিক ক্রীড়া ক্ষেত্রে দেশের শোচনীয় পরাজয় খেলাধূলার দিক থেকে ভারতের শক্তি-সামর্থ্যের দুরবস্থাকে প্রকট করে তুলে ধরে। কিন্তু সাম্প্রতিক কালে আমাদের দেশ ভারত কমনওয়েলথ গেমস, এশিয়াড ইত্যাদি ক্রীড়া ক্ষেত্রগুলিতে পূর্বের তুলনায় বেশ কিছুটা আধিপত্য বিস্তার করতে পেরেছে।

ভারতে খেলাধূলা

তবে খেলাধুলার  দিক থেকে সামগ্রিক উন্নতি ঘটানোর জন্য সরকারের সঠিক পদক্ষেপ নেওয়া উচিত এবং পাশাপাশি দেশবাসীর প্রত্যেকেরই প্রচেষ্টা থাকা উচিত খেলাধূলার দিকে এগিয়ে যাওয়ার। তাছাড়াও কিছু কিছু খেলোয়াড়দের মধ্যে অনেক সময় বিভিন্ন ধরনের কুপ্রবৃত্তি দেখা যায়, যেমন – নিষিদ্ধ ড্রাগ নেওয়ার পর অসৎ উপায়ে খেলায় জয় লাভ করার মানসিকতা, এইরূপ মনোভাবকে তাদের দূর করতে হবে। দেশের ক্রীড়া জগৎ যেন কোনোও ভাবেই কলুষিত না হয়ে ওঠে, সেদিকে সবারই নজর রাখতে হবে। প্রতিটি দেশবাসীকেই খেলাধূলার প্রয়োজনীয়তা এবং প্রভাব সম্পর্কে সচেতনতা গড়ে তুলতে হবে।

উপসংহার, Conclusion 

খেলাধুলা আমাদের মনে এক নির্মল আনন্দ দান করে এবং জীবনকে করে তোলে উপভোগ্য। বিশ্বের প্রায় প্রত্যেকটি দেশেই প্রতি বছর অজস্র প্রতিভাসম্পূর্ণ খেলোয়াড় জন্ম নেয়‌। তাই সকল দেশের সরকারেরই এই সমস্ত প্রতিভা সম্পন্ন খেলোয়াড়দের দিকে লক্ষ্য রাখা উচিত, যেন তারা খেলাধুলার দিক থেকে কোনও রকম সুযোগ সুবিধা থেকে বঞ্চিত না হয়।

খেলাধুলা

বর্তমান সময়ে খেলাধুলা বহু মানুষের জীবিকা হয়ে উঠছে। খেলাধুলা একজন ব্যক্তিকে নাম, খ্যাতি, যশ, অৰ্থ এনে দিতে পারে। তাই দেশের ভবিষ্যত প্রজন্মকে যদি খেলাধুলার সাথে যুক্ত করা হয় তবে তাদের ভবিষ্যতেও সফল, সচল ও গতিশীল ক্রীড়াবিদ হিসেবে গড়ে উঠতে পারে।

Recent Posts