রাস্কিন বন্ড, ব্রিটিশ বংশোদ্ভূত ভারতীয় লেখকের জীবনী, Biography of famous author Ruskin Bond in Bengali   



রাস্কিন বন্ড হলেন একজন ব্রিটিশ বংশোদ্ভূত ভারতীয় লেখক। ভারতীয় ইংরেজি সাহিত্যের এক অন্যতম নক্ষত্র তিনি। যদিও জন্মসূত্রে বন্ড ছিলেন ব্রিটিশ, কিন্তু তাঁর বেড়ে ওঠা সম্পূর্ণ ভারতবর্ষে। তাই নিজের জন্মভূমির মতই তিনি এই দেশকে খুব ভালোবাসেন। 

রাস্কিন বন্ড, ব্রিটিশ বংশোদ্ভূত ভারতীয় লেখকের জীবনী

রাস্কিন বন্ডের  জন্ম ও শৈশব জীবনের বিভিন্ন ঘটনা , Birth and early life of Ruskin Bond

লেখক রাস্কিন বন্ড ১৯৩৪ সালের ১৯ শে মে জন্মগ্রহণ করেছিলেন। একটি মিলেট্যারি হাসপাতালে তাঁর জন্ম হয়েছিল। রাস্কিনের পিতা এক রয়্যাল বিমানবাহিনীতে কর্মরত ছিলেন। তাঁর দুই ভাইবোন ছিল, যাদের নাম এলেন এবং উইলিয়াম। যখন বন্ড মাত্র ৮ বছরের ছিলেন তখন তাঁর মা ও বাবা আলাদা হয়ে যান এবং পরবর্তীতে রাস্কিনের মা এক পাঞ্জাবি-হিন্দুকে বিবাহ করেন। সেই সুবাদে বন্ড নিজের ছেলেবেলা কাটিয়েছিলেন ভারতের গুজরাট রাজ্যের বিজয়নগরে এবং হিমাচলপ্রদেশের শিমলায়। বন্ডের বয়স যখন ১০ বছর অর্থাৎ ১৯৪৪ সালে  হঠাৎ ম্যালেরিয়া রোগে আক্রান্ত হয়ে তাঁর পিতার প্রাণ বিয়োগ ঘটে, তারপর থেকে রাস্কিন উত্তরাখণ্ডের দেরাদুনে নিজের নানীর বাড়িতে থাকতে শুরু করেন। বর্তমানে তিনি নিজের পরিবার নিয়ে ভারতের মুসৌরিতে বসবাস করছেন।  

রাস্কিন বন্ডের  জন্ম ও শৈশব জীবনের বিভিন্ন ঘটনা

ব্রিটিশ লেখিকা এবং ঔপন্যাসিক তাহমিমা আনাম, Biography of Bangladeshi writer Tahmima Anam in Bengali

রাস্কিন বন্ডের শিক্ষা জীবনের ইতিহাস,  History of Ruskin Bond’s Educational Life

 লেখক রাস্কিন বন্ড সিমলায় থাকাকালীন সময়ে বিশপ কটন স্কুলে পড়াশুনা করেছিলেন। সেখান থেকে তিনি ১৯৫১ সালে বিদ্যালয়ের শিক্ষা সম্পন্ন করেন। স্কুলে পড়ার সময় থেকে বিভিন্ন বিষয়ে লেখার জন্য বেশ কিছু পুরস্কার পান তিনি। 

তিনি আরউইন ডিভিনিটি পুরস্কার এবং হেইলি সাহিত্য পুরস্কার সহ স্কুলে বেশ কয়েকটি রচনা প্রতিযোগিতা জিতেছিলেন। তিনি ১৯৫১ সালে ষোল বছর বয়সে “অস্পৃশ্য” নামক তাঁর প্রথম ছোটগল্প লিখেছিলেন। তাঁর উচ্চ বিদ্যালয়ের শিক্ষার পর তিনি পড়াশুনার ক্ষেত্রে আরও ভালো কিছু করার জন্য ১৯৫১ সালে চ্যানেল আইল্যান্ডে (ইউ.কে.) তাঁর এক আত্মীয়ের বাড়িতে চলে যান এবং সেখানে দুই বছর অতিবাহিত করেন। 

কিন্তু সেইখানে মন টেকেনি বলে ফিরে আসেন ভারতে। স্কুলে পাঠরত থাকাকালীন সময় থেকেই তিনি ভালবেসে ফেলেছিলেন ইংরাজি সাহিত্যকে। তখন লেখক রাস্কিনের বোর্ড পরীক্ষা হয়ে গেছে, কিন্তু রেজাল্ট প্রকাশ করা হয়নি। নিজ বাড়িতেই ইংরাজি, ইতিহাস আর ভূগোল নিয়ে বেশ নিশ্চিন্ত মনেই ছিলেন তিনি। কিন্তু তাঁর চিন্তার কারণ ছিল দুইটি বিষয়, অঙ্ক আর ভৌতবিজ্ঞান। 

রাস্কিন বন্ডের শিক্ষা জীবনের ইতিহাস

তাই পরবর্তীতে কী করবেন, কি নিয়ে এগিয়ে যাবেন, কিছুই ঠিক করা ছিলনা এই প্রখ্যাত সাহিত্যিকের। রাসকিনের বাবা তাঁকে উচ্চশিক্ষার জন্য কলেজে ভর্তি হওয়ার কথা বলেছিলেন। অন্যদিকে মা বললেন সেনাবাহিনীতে যোগ দেওয়ার জন্য। 

তাঁর স্কুলের প্রধান শিক্ষক তো বলেই বসলেন যে ভবিষ্যতে শিক্ষক হওয়ার জন্য। কিন্তু তাঁর ইচ্ছে ছিল একজন লেখক হওয়ার, যা শুনে তাঁর পরিবারের কেউই মেনে নিতে পারেন নি।

নিউক্লিয়ার মেডিসিন বিশেষজ্ঞ: ডা. নাসিমা আক্তারের জীবনী, Biography of Dr. Nasima Akter in Bengali

সাহিত্য শৈলীতে রাস্কিন বন্ডের রচনা, Ruskin Bond’s Composition on Literary Style

লেখক রাস্কিন বন্ডের জীবনের অনেকটা সময় কেটেছে শিমলায়, তাই তাঁর সাহিত্য সম্পর্কিত কাজের বেশিরভাগটাই হিমালয়ের পাদদেশে ও পাহাড়, স্টেশন ইত্যাদি দ্বারা অনুপ্রাণিত। কারণ এইসব স্থানেই তিনি নিজের ছেলেবেলা কাটিয়েছেন।

 “পাহাড়ি ঘাসের ঢালে বসে, পাইন গাছের ডালে খেলে বেড়ানো মৃদুমন্দ বাতাসের আমেজে একটা কবিতা লেখা- এ যেন শুধু লেখা নয়, কবিতাটার মধ্যে বাঁচা। আজকে, এত বছর পরে ফিরে দেখলেও আমি যেন ওই বাতাসের ছোঁয়া অনুভব করতে পারি, আর গোটা জঙ্গলের গানটা যেন শুনতে পাই, আর সেটাই আমার প্রতিদিনের, আমার জীবনের কবিতা।” – পাহাড় পর্বত নিয়ে এরূপ ছিল লেখকের মনোভাব।

স্কুল শেষে নিজের জন্মভূমিতে ফিরে গিয়ে ইংরেজি সাহিত্য নিয়ে পড়া শুরু করেন রাস্কিন বন্ড। সেখানকার এক লাইব্রেরী থেকে বই ভাড়া করে এনে বিস্তারিত ইংরেজি সাহিত্য নিয়ে পড়াশোনা করার পর শুরু করে দিলেন লেখার কাজ। সেই সময় নিজের বাবার থেকে দু-এক টাকা করে হাত খরচ হিসাবে পেতেন রাস্কিন বন্ড, লেখার কাজ শুরু করে এবার স্বনির্ভর হওয়ার তাগিদেই সেই টাকায় দেশের বিভিন্ন সাহিত্য পত্রিকায় নিজের লেখা-লিখি পাঠানো শুরু করলেন।

সাহিত্য শৈলীতে রাস্কিন বন্ডের রচনা

প্রথম প্রথম বেশ কয়েকবার নিরাশ হলেও শেষমেশ মাদ্রাজের একটি ছোট পত্রিকা ‘মাই ম্যাগাজিন অফ ইন্ডিয়া’-তে তাঁর একটি গল্প প্রকাশ পায়। এর কিছুদিন বাদেই গল্পটির সাম্মানিক হিসাবে লেখক রাস্কিন বন্ডকে আশ্চর্য করেই তাদের পোস্টাল অ্যাড্রেসে একটি পাঁচ টাকার মানি অর্ডার আসে। সেই থেকে শুরু লেখকের স্বনির্ভর হওয়া। তারপর থেকে মাঝেমাঝেই আসতে থাকে পাঁচ টাকার এমন মানি অর্ডার, যার প্রভাবে নতুন উদ্যমের সাথেই তিনি শুরু করলেন লেখালিখির কাজ। 

 তিনি নিজের লেখা প্রথম উপন্যাস “দ্য রুম অন দ্য রুফ” লিখেছিলেন মাত্র ১৭ বছর বয়সে, এটি প্রকাশ করা হয়েছিল ১৯৫৭ সালে, যখন বন্ডের বয়স ছিল ২১ বছর। তবে এর এক বছরের মধ্যেই তাঁকে ভারত ছেড়ে বিদেশে পাড়ি দিতে হয়। তিনি ইংল্যান্ড চলে যান, অর্থাৎ জন্মসূত্রে যে দেশের মানুষ তিনি সেই দেশে।

“দ্য রুম অন দ্য রুফ” উপন্যাসটিতে ভারতের এক অ্যাংলো ইন্ডিয়ান ছেলে ‘রাস্টি’ ছিল প্রধান চরিত্র। নিজের ব্যক্তিগত জীবনীকেই উপন্যাসের মাধ্যমে ব্যাখ্যা করে দিয়েছিলেন রাস্কিন বন্ড এবং সেই বইয়ের দৌলতে তাঁর কাছে এসেছিল জন লেভেলিন লাইজ পুরস্কার। সেই পুরস্কার এবং সাথে পাওয়া সাম্মানিক অর্থ সঞ্চয় করেই তিনি আবার ভারতে ফিরে এসেছিলেন। কেনো না এই দেশেই যে ছিল তাঁর রসদ তথা বেড়ে ওঠার শিকড়। ভারতে ফিরে আসার পর তিনি নিজের প্রায় ৪০ টিরও বেশি বই প্রকাশ করেছিলেন, রচনা করেছিলেন ৫০০-র বেশি ছোট গল্প।

শিক্ষাবিদ আবদুল্লাহ আল-মুতীর জীবনী, Biography of Abdullah-Al-Muti in Bengali

লেখকের বিখ্যাত সাহিত্যিক রচনাবলী, Author’s famous literary works

লেখকের বিখ্যাত সাহিত্যিক রচনাবলী

রাস্কিন বন্ড বহু উপন্যাস ও ছোটো গল্প লিখেছেন, রচনা করেছেন অনেক মজার মজার সাহিত্য। ছোটো থেকে বড় সকলেই তার লেখা পড়ে গল্পগুলো অনুভব করে, আনন্দ পায়, আমোদিত হয়। অদ্ভুত এক সারল্য আছে তাঁর রচনাগুলোতে, পাহাড়ের গন্ধ যেন মিশে থাকে তাঁর লেখায়। সাধারণ মানুষের জীবনের সাথে সামঞ্জস্য বজায় রাখার ফলেই হয়তো তাঁর লেখা গল্পে অদ্ভুত এক মায়া মাখানো থাকে। তাঁর লেখা বেশ কয়েকটি উপন্যাস অবলম্বনে সিনেমাও নির্মাণ করা হয়েছে, যা বড়ো বড়ো পরিচালক দ্বারা পরিচালিত হয়েছিল। লেখকের বিখ্যাত কিছু উপন্যাসের নাম হল:

উপন্যাস :

দ্য ইন্ডিয়া আই লাভ

ওয়ান্স আপন এ মুনসুন টাইম

দ্য পান্থেরস মুন

দ্য রোড টু দ্য বাজার

দ্য সেন্সুয়ালিস্ট বাই রাস্কিন বন্ড

লান্দউর ডেইস- এ রাইটার জারনাল

এ ফাইট অফ পিগওন্স

রাস্টি রান্স এওয়ে

সিন্স ফ্রম এ রাইটারস লাইফ

ভাগ্রান্তস ইন দ্য ভ্যালি

উইথ লাভ ফ্রম দ্য হিলস

রোডস টুঁ মুসৌরী

দ্য রুম অন দ্য রুফ

দিল্লী ইজ নট ফার

মাহারাণী

টেলস অফ ফশটারগঞ্জ

অল রোডস লিড টু গঙ্গা

রোডস টু মুসৌরি

অ্যাঙ্গরি রিভার

চিলড্রেন অমনিবাস

অ্যনিমেল স্টোরিস

ফানি সাইড আপ

দ্য ব্লু আমব্রেলা

দ্য কাসমিরি স্টোরিটেলার

রাস্কিন বন্ড বহু উপন্যাস ও ছোটো গল্প লিখেছেন

জিনতত্ত্ববিদ মাকসুদুল আলমের জীবনী, Biography of Bangladeshi scientist Maqsudul Alam in Bengali

লেখকের প্রাপ্ত পুরস্কার ও সম্মাননা , Awards and recognition of Ruskin Bond 

নিজের সাহিত্যিক জীবনে অসীম প্রতিভার উপর ভিত্তি করে একাধিক পুরস্কারে ভূষিত হয়েছেন রাসকিন বন্ড। “দ্য ইন্ডিয়ান কাউন্সিল ফর চাইল্ড এডুকেশন” থেকে রাস্কিন বন্ডের ভারতে শিশুদের সাহিত্যের মান বৃদ্ধি করার অগ্রণী ভূমিকাকে স্বীকৃতি দেওয়া হয়েছে। পরবর্তীতে ১৯৯২ সালে তাঁকে Our Trees Still Grow in Dehra- র জন্য সাহিত্য একাডেমি পুরস্কার দ্বারা সম্মানিত করা হয়। এছাড়াও লেখক ১৯৯৯ সালে পদ্মশ্রী পুরস্কার পান এবং ২০১৪ সালে পদ্মভূষণ পুরস্কারে ভূষিত হন।

লেখকের প্রাপ্ত পুরস্কার ও সম্মাননা

করুণাময়ী রাণী রাসমণির জীবনী, Biography of Rani Rashmoni in bengali

লেখকের উপন্যাস ভিত্তিক চলচ্চিত্রের তালিকা,  List of films based on the author’s novels

শুধু বইয়ের পাতায় আটকে থাকেনি লেখক রাসকিন বন্ডের গল্পগুলো। তাঁর গল্পের উপর ভিত্তি করে তৈরি হয়েছে বেশ কয়েকটি সিনেমাও। “দ্য ব্লু আমব্রেলা” গল্পের ভিত্তিতে একই নামে তৈরি করা হয়েছিল একটি সিনেমা। বন্ডের ঐতিহাসিক উপন্যাস “এ ফ্ল্যাইট অফ পিয়গন্স” থেকে হিন্দি চলচ্চিত্র “জুনুন” পরিচালনা করা হয়েছে। এই ছবিটি তৈরি করেছিলেন শশী কাপুর এবং পরিচালনা করেছিলেন শ্যাম বেনেগাল। তাছাড়াও রাস্কিন বন্ডের ছোট গল্প “সুসানাস সেভেন হাসবেনডস” এর উপর ভিত্তি করে বিশাল ভরদ্বাজের পরিচালিত চলচ্চিত্র “৭ খুন মাফ” তৈরি করা হয়েছিল।

লেখকের উপন্যাস ভিত্তিক চলচ্চিত্রের তালিকা

উপসংহার , Conclusion 

নিজের সরলতায় পূর্ণ লেখাগুলোর মাধ্যমে আট থেকে আশি অর্থাৎ প্রায় সকল বয়সের পাঠকদের আমোদিত করার মত ক্ষমতা আছে সাহিত্যিক রাস্কিন বন্ডের কলমে। এর ফলস্বরূপ তিনি ভারত তথা বিদেশেও বেশ জনপ্রিয় হয়ে ওঠেন। পরবর্তীতে দেশের বিভিন্ন শহরে বই প্রকাশ করার অনুষ্ঠানে আমন্ত্রণ পেতে থাকেন তিনি। বিভিন্ন জায়গায় আয়োজিত বইপাঠ অনুষ্ঠানেও দেখা যায় এই প্রবীণ সাহিত্যিককে। শিশু থেকে বয়স্ক সবার মধ্যেই প্রভূত সুনাম অর্জন করেছেন ব্রিটিশ সাহিত্যিক রাস্কিন বন্ড।

Frequently asked questions :

রাস্কিন বন্ড কে ছিলেন?

রাস্কিন বন্ড হলেন একজন ব্রিটিশ বংশোদ্ভূত ভারতীয় লেখক। 

রাস্কিন বন্ড কবে জন্মগ্রহণ করেন?

 ১৯৩৪ সালের ১৯ শে মে।

রাস্কিন বন্ড প্রথম কোন বই লিখেছিলেন?

 “দ্য রুম অন দ্য রুফ”

রাস্কিন বন্ড প্রথম গল্প কোথায় প্রকাশ করেন?

 ছোট পত্রিকা ‘মাই ম্যাগাজিন অফ ইন্ডিয়া’।

রাস্কিন বন্ডের কবে পদ্মভূষণ সম্মান পান?

 ২০১৪ সালে।

Recent Posts